{{ news.section.title }}
এমবাপ্পের এক গোলেই কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স
বিশ্বকাপে নান্দনিক ফুটবল দেখিয়ে আলো কাড়ছিল ফ্রান্স। কিন্তু নকআউট পর্বে সৌন্দর্যের চেয়ে প্রয়োজন ছিল ধৈর্য, শক্তি আর লড়াইয়ের মানসিকতা। ফিলাডেলফিয়ার প্রচণ্ড গরমে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে ঠিক সেটিই দেখাল দিদিয়ের দেশমের দল। দীর্ঘ সময় প্যারাগুয়ের শক্ত রক্ষণভাগের সামনে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এবং টানা চতুর্থ বিশ্বকাপে শেষ আট নিশ্চিত করেছে লে ব্লুজরা।
স্কোরলাইন যতই ছোট হোক, ম্যাচের উত্তাপ ছিল অনেক বড়। ফিলাডেলফিয়ার প্রায় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দুই দলই শুরু থেকেই শারীরিক ফুটবলে জড়িয়ে পড়ে। একের পর এক কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, তর্ক-বিতর্ক, ভিএআর বিতর্ক-সব মিলিয়ে এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন ও শারীরিক লড়াইগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচটিকে "brutal scrap" এবং "ugly but effective football" বলেও উল্লেখ করেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ফ্রান্সের কাছে। প্রথম ১০ মিনিটে প্রায় ৯০ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল তারা। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলা মিলে একের পর এক আক্রমণ সাজালেও প্যারাগুয়ের পাঁচ ডিফেন্ডারের দেয়াল ভাঙা যাচ্ছিল না। কোচের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার-ফ্রান্সকে জায়গা দেওয়া যাবে না, ম্যাচের গতি নষ্ট করতে হবে এবং প্রতিটি আক্রমণে শারীরিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে হবে। সেই পরিকল্পনা প্রথম এক ঘণ্টা পর্যন্ত নিখুঁতভাবেই বাস্তবায়ন করে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
প্রথম ২০ মিনিটে ফ্রান্স একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। প্যারাগুয়ে নিজেরাও খুব বেশি আক্রমণে যায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষকে হতাশ করা এবং সুযোগ পেলে পাল্টা আক্রমণে ওঠা। মাঝমাঠে আন্দ্রেস কুবাস, দিয়েগো গোমেজ ও মাতিয়াস গালারজা ফরাসি মিডফিল্ডকে চেপে ধরেন। অন্যদিকে গোলরক্ষক অরলান্দো গিল আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সে নিজের রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দেন।
আরও পড়ুন: কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে পেল ফ্রান্স, ফিরছে ২০২২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের স্মৃতি
৩৫তম মিনিটে ম্যাচে প্রথম বড় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আন্দ্রেস কুবাসের শক্ত ট্যাকলে মাটিতে পড়ে যান এমবাপ্পে। সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের খেলোয়াড়রা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। ধাক্কাধাক্কি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর পরিস্থিতি সামাল দেন রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ। এরপরও ম্যাচজুড়ে ছোট ছোট সংঘর্ষ চলতেই থাকে।
প্রথমার্ধে কোনো দলই লক্ষ্যে শট রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন ঘটনা মাত্র তৃতীয়বার ঘটল, যেখানে বিরতির আগে কোনো দলই অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।
বিরতির পর খেলার গতি বাড়ায় ফ্রান্স। ৫২তম মিনিটে গোলরক্ষক মাইক মেনিয়ঁর লম্বা পাস ধরে একাই ছুটে গিয়েছিলেন এমবাপ্পে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত স্লাইডিং ট্যাকলে নিশ্চিত গোল বাঁচান হুয়ান কাসেরেস। কিছুক্ষণ পর দেম্বেলের শট সাইড নেটে লাগে, আর মানু কোনোনের দূরপাল্লার শট কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন অরলান্দো গিল।
ঘণ্টাখানেক পর্যন্ত প্যারাগুয়ের পরিকল্পনাই সফল হচ্ছিল। কিন্তু বদলি হিসেবে মাঠে নামা দেজিরে দুয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। ৬৮তম মিনিটে বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়ার সময় তাঁকে পেছন থেকে ফেলে দেন দিয়েগো গোমেজ। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে দিলেও ভিএআরের পরামর্শে মনিটর দেখে সিদ্ধান্ত বদলান এবং ফ্রান্সের পক্ষে পেনাল্টি দেন।
৭০তম মিনিটে স্পটকিক নিতে এসে কোনো ভুল করেননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। নিচু শটে অরলান্দো গিলকে পরাস্ত করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৯তম গোল। এই গোলের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে লিওনেল মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন এবং গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও শীর্ষস্থান আরও শক্ত করেন।
গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে বাধ্য হয়ে কিছুটা ওপরে উঠে খেলতে শুরু করে। তবে পুরো ম্যাচে যেভাবে রক্ষণে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল, আক্রমণে এসে সেই ধার আর ধরে রাখতে পারেনি। উল্টো ম্যাচের শেষদিকে ফ্রান্স আরও কয়েকটি সুযোগ সৃষ্টি করে। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দেজিরে দুয়ের পাস থেকে এমবাপ্পের পরপর দুটি শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন অরলান্দো গিল। পরাজিত দলের জার্সিতে তিনিই ছিলেন অন্যতম সেরা পারফরমার।
শেষ বাঁশি বাজার আগেও এবং পরেও উত্তেজনা থামেনি। ওলিসে, গালারজা, কুবাস ও এমবাপ্পেকে ঘিরে কয়েক দফা ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দলের কোচিং স্টাফ ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
ম্যাচ শেষে এমবাপ্পে বলেন, "অনেকে ভেবেছিল আমরা শুধু সুন্দর ফুটবল খেলতে পারি। কিন্তু প্রয়োজন হলে আমরা কঠিন, শারীরিক এবং লড়াকু ফুটবলও খেলতে পারি। জিততে হলে কখনও কখনও সুন্দর ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু দেখাতে হয়।" অন্যদিকে দিদিয়ের দেশম তাঁর খেলোয়াড়দের ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেন, নকআউট পর্বে এমন ম্যাচই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথ তৈরি করে।
এই জয়ের মাধ্যমে টানা চারটি বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল ফ্রান্স। এখন শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। কাতারে দুই দলের স্মরণীয় লড়াইয়ের পর এবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে আরেকটি হাইভোল্টেজ ম্যাচের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।