কানাডাকে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কো

কানাডাকে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কো
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ করে চলেছে মরক্কো। কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠার রূপকথার পর এবার উত্তর আমেরিকার আসরেও তারা থামছে না। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্বাগতিক কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের দল।

স্কোরলাইন দেখে ম্যাচটি একপেশে মনে হলেও বাস্তবে ছবিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। বলের দখল, আক্রমণের সংখ্যা, কর্নার কিংবা প্রতিপক্ষের বক্সে প্রবেশ-প্রায় সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল কানাডা। কিন্তু বিশ্বমানের দলগুলো যেভাবে সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচ জিতে নেয়, ঠিক সেটিই করেছে মরক্কো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters ম্যাচটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছে, "Morocco punished every Canadian mistake." অর্থাৎ কানাডার প্রায় প্রতিটি ভুলেরই সর্বোচ্চ মূল্য আদায় করেছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।

 

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কানাডা। গ্যালারিতে প্রায় পুরো সমর্থনই ছিল স্বাগতিকদের পক্ষে। প্রথম ২০ মিনিটে জনাথন ডেভিড, তানি ওলুওয়াসেয়ি এবং তেজন বুকানানের গতিময় আক্রমণে কয়েকবারই চাপে পড়ে মরক্কোর রক্ষণভাগ।

 

ম্যাচের অষ্টম মিনিটেই প্রথম বড় সুযোগ তৈরি হয়। বুকানানের নিচু ক্রস থেকে ওলুওয়াসেয়ি শট নিলেও সেটি প্রতিহত করেন গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। কয়েক মিনিট পর আবারও জনাথন ডেভিডের শট বাঁচিয়ে দেন সেভিয়ার এই গোলরক্ষক।

 

প্রথমার্ধের প্রথম ২৫ মিনিটে কানাডা যেভাবে চাপ সৃষ্টি করছিল, তাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতেই ছিল। কিন্তু গোলের সামনে গিয়ে সেই আধিপত্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

প্রথম ২৫ মিনিটে মরক্কো একটি শটও নিতে পারেনি।

 

তবু এই সময়টাতেই বোঝা যাচ্ছিল, মরক্কো তাড়াহুড়া করছে না। তারা অপেক্ষা করছিল সঠিক মুহূর্তের জন্য। ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের দল পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সবচেয়ে ভয়ংকর দলগুলোর একটি। কানাডার বিপক্ষেও তারা একই কৌশল অনুসরণ করে।

 

প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হওয়ার পর বিরতি থেকে একেবারে ভিন্ন ছন্দে মাঠে ফেরে মরক্কো।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।

 

৫০তম মিনিটে আশরাফ হাকিমির নেওয়া দ্রুত ফ্রি-কিক থেকে আক্রমণের সূচনা হয়। কানাডার রক্ষণভাগ তখনও নিজেদের অবস্থান ঠিকমতো নিতে পারেনি। বল পৌঁছে যায় আজ্জেদিন উনাহির কাছে। বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের নিচু শটে তিনি বল পাঠিয়ে দেন জালের নিচের কোণে। গোলরক্ষক ম্যাক্সিম ক্রেপো কোনো সুযোগই পাননি।

 

এই গোলটিই পুরো ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। কারণ, এতক্ষণ আক্রমণ চালানো কানাডা গোল হজম করার পর আরও বেশি ওপরে উঠে খেলতে বাধ্য হয়, আর সেই সুযোগই কাজে লাগায় মরক্কো।

 

গোল হজমের পর জেসি মার্শ একের পর এক পরিবর্তন আনেন। কানাডা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ফুলব্যাকরাও ওপরে উঠে যেতে থাকেন। এর ফলে মরক্কোর জন্য পাল্টা আক্রমণের জায়গা আরও বেড়ে যায়।

 

তবে গোল করার সুযোগ তখনও পাচ্ছিল কানাডা।

 

৭২ মিনিটে জনাথন ডেভিডের হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।

 

৭৯ মিনিটে তেজন বুকানানের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট আবারও ফিরিয়ে দেন ইয়াসিন বুনু। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দারুণ ফর্মে থাকা এই গোলরক্ষক আবারও প্রমাণ করেন কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা শট-স্টপার হিসেবে বিবেচিত।

 

বুনুর কয়েকটি সেভই কানাডার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ করে দেয়। বিশেষ করে বুকানানের শটটি ম্যাচের অন্যতম সেরা সেভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

কানাডা যখন সমতায় ফেরার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই আসে ম্যাচের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

 

৮২তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজ মাঝমাঠ থেকে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করেন। ডান দিক দিয়ে এগিয়ে এসে নিখুঁত পাস বাড়ান আজ্জেদিন উনাহির দিকে। ঠান্ডা মাথায় নিজের দ্বিতীয় গোল করে কানাডার শেষ আশাটুকুও শেষ করে দেন মরক্কোর এই মিডফিল্ডার।

 

উনাহির দুই গোলের মধ্য দিয়ে ম্যাচ প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

 

কিন্তু মরক্কো থামেনি।

 

যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে আবারও ব্রাহিম দিয়াজের পাস থেকে বদলি হিসেবে নামা সুফিয়ান রাহিমি গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন।

 

স্কোরলাইন তখন বাস্তবতার চেয়ে অনেক বড়।

 

কারণ পুরো ম্যাচে কানাডা নিয়েছিল ১০টি শট, মরক্কো মাত্র ৫টি। কর্নারে ব্যবধান ছিল ১১-১। প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শেও অনেক এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু ফুটবলে সব সময় বেশি আক্রমণ করলেই জয় আসে না।

 

ম্যাচের পর মরক্কোর ড্রেসিংরুমে ছিল আনন্দের জোয়ার। কারণ এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্য যে কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, সেটিরই আরেকটি প্রমাণ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ উয়াহবি বলেন, প্রথমার্ধে কানাডা তাদের চাপে রেখেছিল, কিন্তু বিরতির সময় কৌশলগত কিছু পরিবর্তন এবং ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ভুলগুলো দেখানো হয়। দ্বিতীয়ার্ধে সেই পরিবর্তনের ফলই মাঠে দেখা গেছে।

 

উয়াহবি জানান, প্রথম ৪৫ মিনিটে তাঁর দল নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে পারেনি। কানাডার উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন এবং উইং দিয়ে আক্রমণ তাদের সমস্যায় ফেলেছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে আজ্জেদিন উনাহিকে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলানো হয় এবং সেখান থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।

 

এই কৌশলগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুফল পান উনাহি। পুরো ম্যাচে দুটি গোল করে তিনি শুধু ম্যাচসেরার পুরস্কারই জেতেননি, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ২০০২ সালের পর প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে জোড়া গোল করার কীর্তিও গড়েছেন।

 

মরক্কোর তৃতীয় গোলেও বড় অবদান ছিল ব্রাহিম দিয়াজের। স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবলে দীর্ঘদিন নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেওয়া এই মিডফিল্ডার পুরো ম্যাচজুড়েই কানাডার রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখেছেন। দুটি অ্যাসিস্ট করে তিনি চলতি বিশ্বকাপে চারটি অ্যাসিস্টের মালিক হয়েছেন, যা এক আসরে কোনো আফ্রিকান ফুটবলারের নতুন রেকর্ড।

 

তবে ম্যাচের আরেক নায়ক নিঃসন্দেহে গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু।

 

কানাডা প্রথমার্ধে যেভাবে একের পর এক আক্রমণ চালিয়েছে, সেগুলোর অন্তত দুটি গোল হওয়ার মতোই সুযোগ ছিল। জনাথন ডেভিড, তানি ওলুওয়াসেয়ি ও তেজন বুকানানের শট ফিরিয়ে দিয়ে বুনু আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন, কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর কয়েকটি সেভ না থাকলে ম্যাচের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

 

অন্যদিকে, ৩-০ ব্যবধানে হারের পরও নিজের খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন কানাডার প্রধান কোচ জেসি মার্শ।

 

ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ফলাফল হতাশাজনক হলেও তাঁর দল নিজেদের ফুটবল দর্শন থেকে একবারও সরে আসেনি। আক্রমণাত্মক, সাহসী এবং ইতিবাচক ফুটবল খেলেই তারা বিশ্বকাপ শেষ করেছে। মার্শের ভাষায়, "আমি এখনও আমাদের দলকেই বেছে নেব। কারণ আমরা ভয় না পেয়ে ফুটবল খেলেছি।"

 

এই বিশ্বকাপ কানাডার জন্যও ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

১৯৮৬ ও ২০২২ সালের হতাশা পেছনে ফেলে এবারের আসরে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জয় পেয়েছে, প্রথমবার নকআউট পর্বে ম্যাচ জিতেছে এবং প্রথমবার শেষ ষোলোয় উঠেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর স্বাগতিক সমর্থকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, সেটি কানাডিয়ান ফুটবলের নতুন যুগের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

 

তবে মরক্কোর বিপক্ষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে-আধিপত্য আর কার্যকারিতা এক জিনিস নয়।

 

কানাডা পুরো ম্যাচে বলের দখলে পিছিয়ে থাকলেও আক্রমণে ছিল অনেক বেশি সক্রিয়। তারা মরক্কোর চেয়ে দ্বিগুণ শট নিয়েছে, কর্নার পেয়েছে ১১টি, প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকেছে ৩০ বারেরও বেশি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোল করতে পারেনি একবারও।

 

অন্যদিকে মরক্কো খুব বেশি সুযোগ তৈরি না করেও প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুযোগ তৈরি করেছে, গোল করেছে এবং ম্যাচ শেষ করেছে অভিজ্ঞ দলের মতো।

 

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন বাস্তববাদী ফুটবলই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। মরক্কো সেটিই আবারও প্রমাণ করল।

 

২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল আটলাস লায়ন্স। এবারও সেই স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তাদের সামনে।

 

কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল। আর যেভাবে তারা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে নকআউটে নিজেদের পরিণত মানসিকতা, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে, তাতে বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা এখানেই থেমে যাবে-এমনটা বলার সাহস এখন খুব কম দলেরই আছে।


সম্পর্কিত নিউজ