ব্রাজিলের হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই বিদায় নিলেন নেইমার!

ব্রাজিলের হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই বিদায় নিলেন নেইমার!
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে শেষ ষোলোর মঞ্চেই। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের অপ্রত্যাশিত হারে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আরেকটি যুগের অবসান ঘটালেন নেইমার জুনিয়র। প্রায় ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে ব্রাজিল জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

 

‘আমি চেষ্টা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই, আর শেষও হলো এখানেই। এখন সব শেষ।’

 

কাকতালীয়ভাবে ২০১০ সালে ঠিক এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। প্রায় দেড় দশক পর একই স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচও খেললেন তিনি। শেষ ম্যাচে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করলেও আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় নরওয়ে।

 

এই বিদায়ের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। জাতীয় দলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন নেইমার। গোলসংখ্যায় তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি পেলেকেও এবং ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই ক্যারিয়ার শেষ করছেন।

 

শুধু গোল নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নিজের নাম লিখে গেলেন অনন্য এক কীর্তিতে। নরওয়ের বিপক্ষে করা গোলের মাধ্যমে ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬-চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হয়েছেন তিনি। এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু পেলের।

 

ক্যারিয়ারে অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন থাকলেও বিশ্বকাপ ট্রফি স্পর্শ করার স্বপ্ন পূরণ হয়নি নেইমারের। ২০১৪ সালে নিজের দেশের মাটিতে ইনজুরির কারণে সেমিফাইনাল মিস করেছিলেন। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে এবং এবার ২০২৬ সালে নরওয়ের কাছে বিদায় নিতে হয়েছে তাঁকে। ফলে ২০০২ সালের পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শিরোপা-খরা আরও দীর্ঘ হলো।

 

এই বিশ্বকাপও নেইমারের জন্য ছিল সংগ্রামের। ২০২৩ সালের ভয়াবহ হাঁটুর চোটের পর প্রায় ৯৮১ দিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন তিনি। দীর্ঘ পুনর্বাসন শেষে কার্লো আনচেলত্তির দলে জায়গা পেলেও পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে জাতীয় দলে ফিরেছিলেন। এরপর জাপানের বিপক্ষে বেঞ্চে বসে থাকেন। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও বদলি হিসেবেই মাঠে নেমে শেষবারের মতো ব্রাজিলের জার্সিতে গোল করেন।

 

ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে আলিঙ্গন করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় তাঁকে। স্টেডিয়াম ছাড়ার সময়ও চোখের জল লুকাতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমর্থকরা একে ব্রাজিল ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

তবে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন না নেইমার। বর্তমানে তিনি খেলছেন শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। ইউরোপ ও সৌদি আরবে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর নিজের ক্যারিয়ারের শুরু যেখানে হয়েছিল, সেখানেই ফিরে এসেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সান্তোসের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সও করছেন এবং ক্লাব পর্যায়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

 

নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ঝুলিতে বিশ্বকাপ না থাকলেও রয়েছে ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ শিরোপা, অলিম্পিক স্বর্ণপদক এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই শেষ হলো তাঁর আন্তর্জাতিক অধ্যায়। এখন নতুন প্রজন্মের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এনদ্রিক কিংবা অন্যদের কাঁধেই উঠছে ব্রাজিলকে আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফেরানোর দায়িত্ব।


সম্পর্কিত নিউজ