{{ news.section.title }}
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
ঈদুল আজহার আগের দিন সকালে হাসপাতালটির পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে হৃদয়বিদারক এই ঘটনা ঘটে। অল্প সময়ের মধ্যে একে একে ছয় নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ছটফট করতে করতে মারা যায়। ঘটনার খবর প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চিকিৎসক মহল পর্যন্ত নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও রোগীসেবার মান নিয়ে।
ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান, হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ঘটনার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি ছিল। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ সেখানে বিকল্প কোনো কার্যকর ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, অতিরিক্ত ভিড় এবং দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকার কারণে ওয়ার্ডের ভেতরে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তদন্ত কমিটির ধারণা, এই পরিবেশগত পরিস্থিতিই নবজাতকদের মৃত্যুর সম্ভাব্য প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকরা অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বায়ুর গুণগত মান, তাপমাত্রা এবং অক্সিজেনের মাত্রার সামান্য পরিবর্তনও তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া গুরুতর অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
গত ৪ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সেদিন তিনি জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে অবহেলার বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাঠায়।
নোটিশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানতে চাওয়া হয়, কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। মঙ্গলবার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে সেই নোটিশের জবাব দেয়।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি সরকার। নোটিশের জবাব পর্যালোচনা শেষে বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয় এবং এতে ঘটনার দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এর পরদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এদিকে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো শোকাহত। তাদের দাবি, শুধু হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না, যারা অবহেলার মাধ্যমে এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি দেশের হাসপাতালগুলোতে নবজাতক ওয়ার্ড, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং পোস্ট ডেলিভারি ইউনিটের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে।
তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি। এই ঘটনার পর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগী নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে সবার।