রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে ৪ দশকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার শিবিরের ১৯, ছাত্রদলের ২ জন ও ছাত্রলীগের ৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে ৪ দশকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার শিবিরের ১৯, ছাত্রদলের ২ জন ও  ছাত্রলীগের ৭
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে ৪ দশকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার শিবিরের ১৯, ছাত্রদলের ২ জন ও ছাত্রলীগের ৭

স্বাধীনতার পর বেশকিছু বছর শান্ত থাকলেও আশির দশকের শেষের দিকে অশান্ত হতে থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। একদিকে ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী ও ছাত্র ইউনিয়নের ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’, অপরদিকে ছাত্রশিবির।

এরপর ১৯৮২ সালে শুরু হয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই সাড়ে চার দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের ১৯ নেতাকর্মী, ছাত্রলীগের সাতজন, ছাত্রদলের দুইজন এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর চারজন-সহ মোট ৩৩ শিক্ষার্থী রাজনৈতিক বিরোধে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

 

যেগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি ঘটনার বিচার হয়নি। এমনকি এসব ঘটনার দোষীরা রাজনৈতিক আশ্রয়, ক্ষমতার পালাবদল বা বিচারকাজ তদারকিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবসহ বিভিন্নভাবে বেঁচে গেছেন।

 

স্বাধীনতার এক দশক পর ১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১১ মার্চ শিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’- নামে ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্মিলিত হামলা চালালে দুপক্ষের সংঘর্ষে চার শিবিরকর্মী সাব্বির আহমদ, আব্দুল হামিদ, আইয়ুব আলী ও আব্দুল জব্বার এবং মীর মোশতাক এলাহী নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীসহ মোট পাঁচজন নিহত হন।

 

এরপর ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে আবারও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন শিবিরকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম আসলাম হোসাইন। পরদিন পুনরায় সংঘর্ষে নিহত হন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিবিরকর্মী আজগর আলী। এরপর ১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল পুনরায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও শিবিরের সংঘর্ষে নিহত হন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিবিরকর্মী শফিকুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ২২ জুন নিহত হন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিবিরনেতা খলিলুর রহমান।

 

১৯৯২ সালে উপাচার্য ভবনের সামনে ছাত্রলীগ কর্মী মুহাম্মদ আলী নিহত হন। একই দিন সৈয়দ আমির আলী হল ও নবাব আব্দুল লতিফ হলের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিটু নিহত হন। একই বছরের ৭ মে নগরীর নতুন বুধপাড়ায় বোমা বিস্ফরণে শিবিরের আজিবুর রহমান ও মোহাম্মদ ইয়াহিয়া নামের আরও দুইজন নিহত হন।

 

১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ও শিবিরের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা তপন ও শিবিরনেতা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ও উদ্ভিদবিদ্যার রবিউল ইসলাম। এরপর ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও মুস্তাফিজুর রহমান নামের আরও দুই শিক্ষার্থীকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে দূর্বৃত্তরা। দুজনই শিবিরনেতা ছিলেন। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই এলাকায় ঢাকাগামী বাস থেকে নামিয়ে কুপিয়ে ও ইট দিয়ে মাথা থেতলে ছাত্রমৈত্রীর নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে হত্যা করে দুর্বত্তরা।

 

১৯৯৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জাসাস) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। ৮ বছর পর ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ এপ্রিল মারা যান শিবিরের সাইফুদ্দিন।

 

এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৬ শিক্ষার্থী। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির সেক্রেটারি শরিফুজ্জামান নোমানীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তৎকালীন সরকার অভিযুক্তদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দিয়ে পুরষ্কৃত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

এরপর ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে দূর্বৃত্তরা ছাত্রলীগকর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ফারুক হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে শিবির নেতা হাফিজুর রহমান শাহীন নিহত হন। একই বছর দলীয় কর্মীরা হলের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করে ছাত্রলীগ কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে।

 

দুই বছর পর ২০১২ সালের ১৫ জুলাই টাকা ভাগাভাগির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সভাপতি আহমেদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বিপু গ্রুপের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগকর্মী আব্দুল্লাহ আল হাসান নিহত হন। এর দুই বছর পর ২০১৪ সালে নিজ কক্ষে দলীয় কর্মীদের গুলিতে নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ। এই হত্যা মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় ১২ আসামির সবাই অব্যাহতি পান।

 

সর্বশেষ ২০১৬ সালে আবাসিক হলের ড্রেন থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের কোন আসামীকে এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

 

অধিকাংশ হত্যা মামলার আসামি খালাস পেয়েছে, প্রায় সব মামলাই খারিজ হয়ে গেছে। এদের মধ্যে সবথেকে আলোচিত শিবির নেতা শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যায় আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ২৭ আসামির সবাই।

 

শিক্ষার্থীরা বলছেন 'রাজনৈতিক চাপ আর তদারকির অভাবেই মামলাগুলো থেকে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। মামলা পরিচালনায় কিছুদিন পর থেকে তেমন কোন ভূমিকাও রাখেনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ২৪ এর জুলাই পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী হত্যার মতো ভয়াবহ স্মৃতি আর ফিরে না আসুক।'

 

পুলিশ বলছে, প্রয়োজনীয় সাক্ষীর অভাব ও বাদী পক্ষের তদারকি নেই। আর এসব মামলায় কোন রাজনৈতিক চাপ থাকে না। আরও সমস্যা হচ্ছে সাক্ষীর অপর্যাপ্ততা, তারা সাক্ষ্যও দিতে চায় না।

 

এ বিষয়ে রাবি শিবির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, আমাদের অসংখ্য ভাইকে এই ক্যাম্পাসে শহিদ করা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের শতশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, কারো হাত কারো পা কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একজনেরও সঠিক বিচার হয়নি। নবীন বরণে বিনা উষ্কানিতে ছাত্রশিবিরের উপর হামলা করে চারজন ভাইকে শহিদ করার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছিল। ঘুমন্ত ও রোজারাখা অবস্থায় আমাদের ভাইদের হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা বিচার পাইনি। ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির সেক্রেটারি শরিফুজ্জামান নোমানী ভাইকে কুপিয়ে শহিদ করা হয়েছে। যার সব আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। পুরষ্কারস্বরূপ বিভিন্ন জায়গা পদায়ন করা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমরা আর এমন ক্যাম্পাস চাই না, যেখানে পড়াশোনা করতে এসে মায়ের বুক খালি হবে। আমরা সুস্থ ধারার রাজনীতিচর্চা চাই। যেখানে সব ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে। শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হোক। সবাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করুক, এটাই প্রত্যাশা।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল বলেন, ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গুপ্তবাহিনী ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আবার ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জাসাস) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানকে গুপ্তভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

 

তিনি আরও বলেন, এই ক্যাম্পাসসহ সারাদেশে গুপ্তবাহিনীর ইতিহাস হত্যার ইতিহাস। তারা সুযোগ পেলেই গুপ্তহত্যা করেছে। তাদের পূর্বপুরুষ যেমন পাকিস্তানিদের সহযোগী হিসেবে এদেশের মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছিল, তারাও তেমনি ক্যাম্পাসগুলোতে হত্যার ইতিহাস কায়েম করেছে। আমি তাদেরকে বলতে চাই, আপনারা রাজনীতি করতে চাইলে সুস্থভাবে রাজনীতি করুন। গুপ্তপথ পরিহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাতারে আসুন। নয়তো এদেশের ছাত্রসমাজ আপনাদের উপযুক্ত জবাব দিবে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, নিহত শিক্ষার্থীদের ঘটনাগুলো সম্পর্কে আমার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় সাধারণত বাদী-বিবাদী মধ্যে হয়ে থাকে এবং বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজে থেকে বাদী হয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।

 

তিনি আরও বলেন,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়। জুলাই বিপ্লবের পর যে ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারা চালু হয়েছে, তা বহাল থাকবে। আশা করছি ভবিষ্যতেও ছাত্র রাজনীতি আগের সেই ধারা ক্যম্পাসে আর ফিরবেনা।


সম্পর্কিত নিউজ