{{ news.section.title }}
ভারতের অনুমোদন না মেলায় কমছে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি
আগামী ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬০ মেগাওয়াট নয়, মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে নেপাল। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ভারতীয় অনুমোদন না মেলায় আপাতত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নেপালের জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (সিইএ) বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা সীমিত থাকার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন স্থগিত রেখেছে। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি, নেপাল-ভারত জ্বালানি সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির কিছু সিদ্ধান্ত এবং কয়েকটি কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়ায় নতুন বিদ্যুৎ রপ্তানি ব্যবস্থা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নেপাল প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় সে সময় তারা বাংলাদেশ ও ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে থাকে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুম এবং শীতকালে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিলে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে।
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সচিব পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছিল। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় চুক্তি ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়েও একমত হন।
এরপর নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (NEA) আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থা পাওয়ার ট্রেডিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (PTC India)-এর কাছে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানায়।
তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নেপালকে জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পরিবহনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। ফলে আপাতত নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহ অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক বাহাদুর থাপা বলেন, “এবার বাংলাদেশে শুধুমাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যাবে। যদিও বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি, তবুও আগের ব্যবস্থার মতো ভারতীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে আমরা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু তারা জানিয়েছে, বর্তমান সঞ্চালন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পরিবহনের সক্ষমতা নেই।”
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় বিদ্যুৎ পরিবহনের পর্যাপ্ত লাইন না থাকায় বিদ্যুৎ বাণিজ্য কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্প্রসারণ করা যায় না।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎসের অন্তর্ভুক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতীয় ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নেপালের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের পথ উন্মুক্ত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ পৌঁছায়। সেদিন পরীক্ষামূলকভাবে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। নেপালের উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে ঢালকেবার-মুজাফ্ফরপুর ৪০০ কেভি আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর ভারতের বহরমপুর-ভেড়ামারা ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মূলত আন্তঃদেশীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ওপর। বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়টি সাময়িকভাবে আটকে গেলেও ভবিষ্যতে নতুন সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন হলে নেপাল থেকে আরও বেশি বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি নিয়ে নেপাল ও ভারতের মধ্যে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন হবে। তবে সেই আলোচনা কবে অনুষ্ঠিত হবে কিংবা কবে নাগাদ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন মিলতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল দ্রুতই এই জটিলতার সমাধানে এগিয়ে আসবে এবং ভবিষ্যতে নেপালের জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি মিশ্রণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট