{{ news.section.title }}
ডলারের চাপে টানা পতনে স্বর্ণের বাজার
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ কিংবা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই সাধারণত বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরেই সোনা বা স্বর্ণকে ‘সেফ হ্যাভেন অ্যাসেট’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধ কিংবা আর্থিক বাজারের অস্থিরতার সময় সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়তে দেখা যায়। তবে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে স্বর্ণবাজারে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেটি কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আর্থিক খাতকে নাড়িয়ে দিলেও স্বর্ণের বাজার প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে ধারাবাহিক পতনের ফলে গত শুক্রবার দাম নেমে এসেছে প্রায় ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে স্বর্ণের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। সাধারণ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার কথা থাকলেও বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নীতির দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে পারে-এমন আশঙ্কা স্বর্ণের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা যেভাবে বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেলের দাম কয়েক দফা লাফিয়ে বাড়ে এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে শুরু করে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই প্রভাব ফেলেনি, বরং উৎপাদন ব্যয়, খাদ্য সরবরাহ, শিল্পপণ্য এবং ভোক্তা পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর। অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধরনের ‘ইনফ্লেশন শক’ তৈরি করেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
কেন মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও বাড়ছে না স্বর্ণের দাম?
সাধারণভাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে মানুষ তাদের সম্পদের মূল্য ধরে রাখতে স্বর্ণে বিনিয়োগ করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বেকারত্ব কম এবং কর্মসংস্থান স্থিতিশীল থাকায় ফেডারেল রিজার্ভের ওপর সুদের হার কমানোর চাপ কমে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন মনে করছেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখা হবে। এমনকি প্রয়োজনে আরও বাড়ানো হতে পারে। এখানেই স্বর্ণের সঙ্গে শুরু হয়েছে সুদের হারের সরাসরি প্রতিযোগিতা।
সুদের হার বাড়লে কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বর্ণ?
স্বর্ণকে ‘নন-ইয়েল্ডিং অ্যাসেট’ বলা হয়। অর্থাৎ ব্যাংক আমানত, বন্ড বা কিছু আর্থিক সম্পদের মতো স্বর্ণ থেকে নিয়মিত কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। একজন বিনিয়োগকারী স্বর্ণ কিনে মূলত ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় বসে থাকেন।অন্যদিকে সুদের হার বেশি থাকলে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা, সরকারি বন্ড কেনা কিংবা ডলারভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করা তুলনামূলক বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে।
অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েলের ভাষায়, স্বর্ণ প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি সম্পদগুলোর একটি হলেও এটি কোনো লভ্যাংশ বা নিয়মিত আয় দেয় না। ফলে উচ্চ সুদের পরিবেশে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের পরিবর্তে সুদবহনকারী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ডলারের শক্তি স্বর্ণকে কেন চাপে ফেলছে?
স্বর্ণের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারিত হয় মার্কিন ডলারে। ফলে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে স্বর্ণ সাধারণত চাপের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মার্কিন ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে বেছে নিয়েছেন।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লামের মতে, ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের দাম সাধারণত কমে যায়। আবার ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান স্বর্ণবাজারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার এবং স্বর্ণের মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা চলছে। আর এই মুহূর্তে বিনিয়োগকারীরা ডলারের প্রতিই বেশি আস্থা দেখাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আচরণও বদলে গেছে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়িয়ে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের অনেকেই মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়চাপ কিছুটা কমে যাওয়াও স্বর্ণের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের চাহিদার বড় একটি অংশ এসেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা থেকে।
যুদ্ধ শেষের সম্ভাবনায় বাজারে সামান্য স্বস্তি
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনা সামনে আসার পর স্বর্ণবাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
জাস্টিন কার্ডওয়েলের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা ধরে নিতে পারেন যে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপও ধীরে ধীরে কমবে। তবে সেই প্রভাব বাস্তবে দেখা যেতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
সামনে কোন পথে যাবে স্বর্ণ?
বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, স্বর্ণ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যসীমায় অবস্থান করছে। এখান থেকে দাম আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, আবার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে আরও নিচেও নামতে পারে। স্বর্ণের ভবিষ্যৎ এখন মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে-যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি, ডলারের শক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি। যদি ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে স্বর্ণের বাজার দ্রুত চাঙ্গা হতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার দীর্ঘায়িত হলে স্বর্ণের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ২০২৬ সালের স্বর্ণবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার-দুটি শক্তির উপস্থিতি। সাধারণত স্বর্ণ মুদ্রাস্ফীতি থেকে লাভবান হয়, কিন্তু বর্তমানে সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব সেই সুবিধাকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণও এবার এক ব্যতিক্রমী অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।