আব্বাস আরাঘচির পদত্যাগের দাবিতে ইরানে বিক্ষোভ

আব্বাস আরাঘচির পদত্যাগের দাবিতে ইরানে বিক্ষোভ
ছবির ক্যাপশান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি | ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি ও কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে মন্তব্য করায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বিরুদ্ধে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সময় শনিবার (১৩ জুন) উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা তার পদত্যাগ দাবি করেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে আরাঘচির বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই দেশটির কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা কোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করে আসছে, তারা আরাঘচির অবস্থানের সমালোচনা শুরু করে।

 

ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মাশহাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছেন। অনেককে কালো পোশাক ও কালো চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। তাদের হাতে লাল ও কালো পতাকা ছিল এবং তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের একাংশ ‘আরাঘচির পদত্যাগ চাই’, ‘জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস নয়’ এবং ‘প্রতিরোধের পথেই সমাধান’ ধরনের স্লোগান দেন।

 

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও কয়েকটি ভিডিওতে রাজধানী তেহরানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ছোট পরিসরে বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির পাশাপাশি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা সামনে আসার পর থেকেই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কূটনৈতিক পথ অনুসরণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি অংশ রয়েছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতা ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

 

শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাঘচি বলেন, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও প্রতিরোধমূলক উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

তবে তিনি স্পষ্টভাবে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে ঘোষণা দেননি। বরং তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো চলমান রয়েছে এবং আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরাঘচির মন্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে ইরানি জনগণকে ধারণা দেওয়া। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এটিকে ভিন্নভাবে দেখছে।

 

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সম্ভাব্য কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়, তাহলে তা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাদের দাবি, পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন সমঝোতা ইরানের প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি।

 

এদিকে ইরানের সংস্কারপন্থি ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি রপ্তানি এবং আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক করতে হলে কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।

 

পর্যবেক্ষকদের মতে, আব্বাস আরাঘচিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল একজন মন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নয়; বরং এটি ইরানের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনেরও প্রতিফলন।

 

বর্তমানে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও বিষয়টি ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে দেশটির ভেতরে এখনো গভীর মতবিরোধ বিদ্যমান রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ