{{ news.section.title }}
কুয়েতে ২ হাজারের বেশি নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে
কুয়েত সরকার আরও ২ হাজার ১৯৩ জন ব্যক্তির কুয়েতি নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে। সরকারি গেজেট কুয়েত আল-ইয়াওম-এ প্রকাশিত সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নন, তাদের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া নির্ভরশীল সদস্যদের নাগরিকত্বও বাতিল করা হয়েছে। ফলে নতুন এই সিদ্ধান্তের আওতায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার (১৪ জুন) দেশটির সংবাদমাধ্যম আরব টাইমস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুয়েত সরকার ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত পুরোনো নথি ও আবেদনপত্র পুনঃতদন্ত এবং পুনর্মূল্যায়নের একটি বৃহৎ কর্মসূচি শুরু করে। এরপর থেকে সুপ্রিম কমিটি ফর দ্য ইনভেস্টিগেশন অব কুয়েতি ন্যাশনালিটি ধারাবাহিকভাবে নাগরিকত্ব ফাইল যাচাই-বাছাই করে আসছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৪৬৪ জনের নাগরিকত্ব বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে একাধিক ধাপে আরও হাজার হাজার ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। সর্বশেষ ২ হাজার ১৯৩ জনের নাম যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বেড়ে গেল।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ এর প্রভাবে পড়েছেন। কারণ কুয়েতের নাগরিকত্ব আইনে একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল হলে তার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া সন্তান, স্ত্রী বা অন্যান্য নির্ভরশীল সদস্যরাও একই সিদ্ধান্তের আওতায় চলে আসেন। যদিও সরকার এখনো নির্ভরশীলদের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
কুয়েতের ১৯৫৯ সালের জাতীয়তা আইন (আইন নং ১৫) অনুযায়ী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব বাতিল বা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক পুনর্মূল্যায়ন কার্যক্রমেও সেই আইনি বিধানগুলোর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নাগরিকত্ব বাতিলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি। কুয়েত সাধারণত দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। ফলে কোনো ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে কুয়েতি নাগরিকত্ব হারানোর বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে এমন অনেক মামলাও পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে নাগরিকত্ব অর্জনের অভিযোগেও বহু মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতারণা বা তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকত্ব বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও নাগরিকত্ব বাতিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের নজির রয়েছে।
বিশেষ করে বিবাহ, নির্ভরশীলতা কিংবা ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের ফাইল নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, অতীতে দেওয়া কিছু নাগরিকত্ব অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম বা তথ্যগত অসঙ্গতি ছিল কি না, তা যাচাই করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুয়েত সরকার বলছে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো নাগরিকত্ব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং বিশ্বাসযোগ্য করা। একই সঙ্গে জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং জাতীয় পরিচয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও এই কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। সম্প্রতি জাতীয়তা আইনে আনা সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রদান ও বাতিল সংক্রান্ত বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে।
তবে সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, ব্যাপক পরিসরে নাগরিকত্ব বাতিলের ফলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। নাগরিকত্ব হারানোর কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা এবং আবাসনসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে কুয়েতে বসবাস করছে এবং নিজেদের কুয়েতি সমাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নাগরিকত্ব হারালে তাদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান এবং সন্তানদের শিক্ষাজীবন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কুয়েতের নাগরিকত্ব পুনর্মূল্যায়ন কর্মসূচি দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ও আইনি উদ্যোগগুলোর একটি। আগামী মাসগুলোতে আরও ফাইল পর্যালোচনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় নাগরিকত্ব ইস্যুটি দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।