ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তির ইঙ্গিত, স্বস্তিতে তেলের বাজার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তির ইঙ্গিত, স্বস্তিতে তেলের বাজার
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ

প্রায় সাড়ে তিন মাসের সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি প্রাথমিক শান্তি সমঝোতায় পৌঁছেছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের এমন ইঙ্গিতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একদিনেই চার শতাংশের বেশি কমেছে, যা গত মার্চের পর সবচেয়ে বড় পতনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পৃথকভাবে জানিয়েছেন, দুই দেশ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং যুদ্ধের অবসান ও পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

 

চুক্তির খবর প্রকাশের পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার ৫৮ সেন্ট বা ৪ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ৮৩ ডলার ৭৫ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪ ডলার ১ সেন্ট বা প্রায় ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে ৮০ ডলার ৮৭ সেন্টে দাঁড়ায়। এর আগে শুক্রবারও তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমেছিল।

 

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে গত কয়েক মাস ধরে যে ‘ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়েছিল, শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তার বড় অংশ দ্রুত কমতে শুরু করেছে। বাজার এখন ধরে নিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পথ খুলছে।

 

ইরানের আধা-সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এরপর ৬০ দিনের একটি আলোচনাপর্ব শুরু হবে, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এর ফলে জ্বালানি, খাদ্য, সার ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বহু দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পায়।

 

যুদ্ধ চলাকালে ব্রেন্ট তেলের দাম কয়েক দফায় ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং একপর্যায়ে ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হয়। জ্বালানি বিশ্লেষকরা একে ১৯৭০-এর দশকের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর সবচেয়ে বড় সরবরাহ ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, বাজার এখন তেলের সরবরাহ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে মূল্যায়ন করছে। বিনিয়োগকারীরা ধরে নিচ্ছেন, যুদ্ধের কারণে যে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল তা ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।

 

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধুমাত্র চুক্তির ঘোষণা দিলেই সব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে না। যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদক দেশগুলো কত দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে, রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে পারে এবং বীমা ও শিপিং খরচ স্বাভাবিক পর্যায়ে নামাতে পারে, তার ওপরও বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

 

কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার পণ্য বিশ্লেষক বিবেক ধর জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ দিকে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে স্থিতিশীল হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ফলে নতুন কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে দাম আবারও দ্রুত বাড়তে পারে।

 

এদিকে বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যায়েও ফিরে এলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তখন জ্বালানি বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যা তেলের দামকে আরও নিচের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার খসড়ায় ইরানের জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করা, তেল রপ্তানিতে সীমিত ছাড় দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায়।

 

বিশ্ববাজার এখন নজর রাখছে সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে। কারণ এই সমঝোতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসানই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। যদি চুক্তিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে গত কয়েক মাস ধরে চলা জ্বালানি অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ