যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১১ স্কাইডাইভারসহ নিহত ১২

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১১ স্কাইডাইভারসহ নিহত ১২
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় ১১ জন স্কাইডাইভার ও একজন পাইলট নিহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে অঙ্গরাজ্যটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটি এটি। দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও বিমানটিতে থাকা কারও প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সময় রোববার সকাল প্রায় ১১টা ২০ মিনিটে মিজৌরির বাটলার মেমোরিয়াল বিমানবন্দর থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করে। বেটস কাউন্টি ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানটি একটি স্কাইডাইভিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠিান ভাড়া নিয়েছিল। নিয়মিত স্কাইডাইভিং মিশনের অংশ হিসেবে যাত্রীরা বিমানে ছিলেন এবং নির্ধারিত উচ্চতায় পৌঁছানোর পর তাদের প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেওয়ার কথা ছিল।

 

তবে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকেনি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিমানটি প্রয়োজনীয় উচ্চতায় উঠতে ব্যর্থ হয়। এরপর হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাঁ দিকে মোড় নেয় এবং বিমানবন্দর থেকে মাত্র প্রায় ২০০ গজ দূরে মাটিতে আছড়ে পড়ে। সংঘর্ষের পর বিমানটির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

 

বেটস কাউন্টির শেরিফ চ্যাড অ্যান্ডারসন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এটি একটি বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা। আমরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।” তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন স্বজন এবং প্রত্যক্ষদর্শী নিজেদের চোখের সামনে বিমানটিকে বিধ্বস্ত হতে দেখেছেন।

 

মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় পড়া বিমানটি ছিল নিউজিল্যান্ডে নির্মিত প্যাসিফিক অ্যারোস্পেস পি-৭৫০ (Pacific Aerospace P-750) মডেলের। এই ধরনের বিমান সাধারণত স্কাইডাইভিং কার্যক্রম, মালামাল পরিবহন এবং বিশেষ ধরনের আঞ্চলিক ফ্লাইটে ব্যবহৃত হয়। বিমানটি স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও অবতরণের সক্ষমতার জন্য পরিচিত হলেও এবার উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

 

এফএএ আরও জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় বিমানটি যে আকাশসীমায় উড়ছিল, সেখানে বাধ্যতামূলক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল যোগাযোগের প্রয়োজন ছিল না। ফলে বিমানটি নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছিল। তবে এটি দুর্ঘটনার কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের আগ পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

 

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় উদ্ধারকারী দল আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। কারণ প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো স্কাইডাইভার হয়তো বিমান থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তবে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিমানে থাকা সবাই দুর্ঘটনার সময় ভেতরেই ছিলেন এবং কেউ বেঁচে নেই।

 

নিহতদের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অবহিত করার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মরদেহ শনাক্তকরণের কাজ করছেন।

 

মিজৌরির বাটলার শহরটি কানসাস সিটি থেকে প্রায় ৫০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। তুলনামূলক ছোট এই শহরে বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা বিরল। ফলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

 

এদিকে দুর্ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে মার্কিন ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি)। সংস্থাটির তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। তারা বিমানের ধ্বংসাবশেষ, ইঞ্জিন, ফ্লাইট রেকর্ড, রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত নথি এবং আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করবেন।

 

বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, উড্ডয়নের পর প্রয়োজনীয় উচ্চতায় উঠতে না পারা সাধারণত ইঞ্জিনের শক্তি হ্রাস, যান্ত্রিক ত্রুটি, অতিরিক্ত ওজন, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা অথবা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

 

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ স্কাইডাইভিং কার্যক্রমে অংশ নেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ফ্লাইট নিরাপদভাবে পরিচালিত হয়। তবে মাঝে মাঝে এমন দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো স্কাইডাইভিং শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু মিজৌরির জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। কারণ একসঙ্গে ১২ জনের প্রাণহানির ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ স্কাইডাইভিং-সংক্রান্ত বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এনটিএসবি জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেই প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে, ঠিক কী কারণে উড্ডয়নের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে বিধ্বস্ত হয়েছিল।


সম্পর্কিত নিউজ