{{ news.section.title }}
হরমুজ খুললে কমবে জ্বালানি চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক শান্তি সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হতে পারে। চুক্তিটি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং ইরানের ওপর আরোপিত কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ শিথিল হওয়ার পথ তৈরি হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ভিত্তি তৈরি করবে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি একে “মহান চুক্তি” বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, এটি অঞ্চলজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে চুক্তি নিয়ে এখনো কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কয়েক দফায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি “অবিলম্বে” খুলে দেওয়ার কথা বললেও পরে তিনি স্পষ্ট করেন যে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পরই প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি, জ্বালানি ব্যবসায়ী এবং বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চুক্তির চূড়ান্ত ভাষা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খসড়া চুক্তির বিভিন্ন অংশ অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ব্যবস্থাপনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা, কিছু তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরানের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি এই পথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের সময় প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বহু দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়।
শান্তিচুক্তির খবর প্রকাশের পরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একদিনে চার শতাংশের বেশি কমে মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধজনিত যে অতিরিক্ত ঝুঁকি বা “জিওপলিটিক্যাল রিস্ক প্রিমিয়াম” তেলের দামে যুক্ত হয়েছিল, তা এখন দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, বাজার এখন ধরে নিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। ফলে তেলের দামে যুদ্ধজনিত চাপ অনেকটাই কমে যেতে পারে। অন্যদিকে কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার বিশ্লেষক বিবেক ধর মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যায়ে ফিরে এলেও বিশ্ববাজারে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা। বর্তমানে যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে যুদ্ধবিরতি, নৌ চলাচল এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত, পারমাণবিক স্থাপনার ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় স্থান পাবে। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে।
পাকিস্তান এই সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দুই পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। কাতারসহ আরও কয়েকটি আঞ্চলিক দেশও আলোচনায় সহযোগিতা করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সব পক্ষ সমানভাবে আশাবাদী নয়। ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো চুক্তির কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছে। একইভাবে ইসরাইলও এই আলোচনার অংশ নয় এবং লেবানন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের অবস্থান আলাদা। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি খাত এবং কূটনৈতিক মহল এখন সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিকে নজর রাখছে। কারণ এই সমঝোতা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধই নয়, বরং গত কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তারও বড় অংশ কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করবে কি না, সেটিও এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।