হরমুজ প্রণালি খুলছে, কাউকে আর কখনও টোল দিতে হবে না : ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালি খুলছে, কাউকে আর কখনও টোল দিতে হবে না : ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১৯ জুন শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালিতে স্থাপন করা মাইন বা জলমাইন অপসারণের কাজ শুরু হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে প্রণালিটি। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য কোনো দেশ বা জাহাজকে টোল দিতে হবে না।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রণালির বিভিন্ন অংশে জলমাইন স্থাপন করে এবং জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস করা হয়, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। অন্য দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষেত্রেও বিশেষ অনুমতি এবং টোল প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

 

এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতেও। বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তখন সতর্ক করেছিল যে দীর্ঘ সময় হরমুজ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে।

 

সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। এপ্রিলের শুরুতে ওয়াশিংটন ইরানের প্রধান সামুদ্রিক বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে ইরানের বন্দরগুলোতে আন্তর্জাতিক জাহাজ প্রবেশ ও প্রস্থান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ইরানের তেল রপ্তানি, আমদানি কার্যক্রম এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক চাপই শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, পাকিস্তান ও কাতার গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামাবাদ ও দোহার ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান অবশেষে একটি কাঠামোগত সমঝোতার বিষয়ে একমত হতে শুরু করে। আলোচনার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা। সূত্রগুলো বলছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশকে ৬০ দিনের একটি আলোচনাকাল দেওয়া হবে। এই সময়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি, তবু উভয় পক্ষ আলোচনার পথ খোলা রাখতে সম্মত হয়েছে।

 

এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে গেলে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং যুদ্ধজনিত ঝুঁকির কারণে যে অতিরিক্ত মূল্য যোগ হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসবে।

 

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা সহজ হবে না। তাছাড়া ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক মহলও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে।

 

তবুও আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ মনে করছে, যদি এই সমঝোতা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন নজর ১৯ জুনের দিকে, কারণ ওই দিনই স্পষ্ট হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতাগুলোর একটি বাস্তবে রূপ পাচ্ছে কি না।

 

তথ্যসূত্র : সিএনএন, বিবিসি


সম্পর্কিত নিউজ