ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলে প্রস্তুত ইউরোপের চার দেশ

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলে প্রস্তুত ইউরোপের চার দেশ
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের চার প্রভাবশালী দেশ-যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি-ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে চার দেশের নেতারা জানিয়েছেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং সম্ভাব্য চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়ন করে, তাহলে তারা দেশটির ওপর আরোপিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রস্তুত।

 

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে আমরা এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান চাই, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।”

 

এই ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। কারণ ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও বাস্তবে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়।

 

রোববার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বিকেলে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় লিখেছেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।” তার এই মন্তব্যের পরপরই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

 

ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেন, ইসলামাবাদ ও দোহার মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তির যুগের সূচনা করতে পারে।”

 

জানা গেছে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে এতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। এতে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নয়, লেবাননসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন উত্তেজনাপূর্ণ ফ্রন্টও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয়ও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় থেকে লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হবে।

 

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, বর্তমান সমঝোতা মূলত একটি প্রাথমিক কাঠামো। এর আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে আরও বিস্তৃত একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেই আলোচনায় ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ক নানা প্রশ্ন স্থান পাবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করেছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

 

চুক্তির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। গত কয়েক মাস ধরে এই রুটে চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পায়।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের জ্বালানি রপ্তানি এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, তিনি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তার ভাষায়, “বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও।” এই বার্তা প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করে।

 

সোমবার দিনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধজনিত ঝুঁকি কমে আসার কারণে বিনিয়োগকারীরা আবারও স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছেন।

 

তবে সব পক্ষ সমানভাবে আশাবাদী নয়। ইসরায়েল এখনো এই সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দেশটি আগে থেকেই জানিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় তারা সরাসরি অংশগ্রহণ করছে না। ফলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

 

তারপরও কূটনৈতিক মহলের বড় অংশ মনে করছে, যদি এই সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর হয় এবং পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।


সম্পর্কিত নিউজ