{{ news.section.title }}
কঙ্গোর ইবোলা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসতে লাগতে পারে এক বছর
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা রেড ক্রস। সংস্থাটির কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো মহামারির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং সংক্রমণের প্রকৃত মাত্রা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইএফআরসি) ইবোলা কার্যক্রম ব্যবস্থাপক ব্রুনো মিশন পূর্ব কঙ্গো থেকে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। অনেক এলাকা সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত নজরদারির বাইরে রয়েছে। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হিসাবে কঙ্গোতে ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮২ জনে পৌঁছেছে এবং অন্তত ১৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি ইতোমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্ডিবুগিও (Bundibugyo) ধরনের ইবোলা ভাইরাস, যা অত্যন্ত বিরল। এই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এ কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ইতুরি প্রদেশে। পাশাপাশি উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভুতেও রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী উগান্ডাতেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যা আঞ্চলিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোগটি শনাক্ত হওয়ার আগেই কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে রোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হওয়ার সময় পর্যন্ত শত শত মানুষ সংক্রমিত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে এখন সংক্রমণের উৎস এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষের মাত্র ৫৬ থেকে ৫৭ শতাংশকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে এই হার আরও অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন। যোগাযোগ অনুসন্ধানের (Contact Tracing) ঘাটতির কারণে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করতে দেরি হচ্ছে।
সংঘাত পরিস্থিতিও রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ব কঙ্গোর বিস্তীর্ণ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, হামলা ও সহিংসতার কারণে অস্থিতিশীল। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে পারছেন না। কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসা অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, পূর্ব কঙ্গোতে পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে। এসব মানুষের একটি বড় অংশ অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যসেবার মারাত্মক সংকট রয়েছে। সম্প্রতি একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরেও ইবোলায় মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হওয়ায় নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
রেড ক্রস জানিয়েছে, অনেক এলাকায় এখনো জনগণের মধ্যে ভয়, গুজব এবং অবিশ্বাস রয়েছে। অনেক পরিবার আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নিতে চায় না। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দাফনের পরিবর্তে গোপনে মৃতদেহ দাফনের ঘটনাও ঘটছে। এসব কারণে ভাইরাস আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আফ্রিকা সিডিসি, রেড ক্রস, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। আক্রান্ত এলাকায় জরুরি চিকিৎসা দল পাঠানো, ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা রাখা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত শত শত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং হাজার হাজার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে রোগের বিস্তার যে গতিতে বাড়ছে, তাতে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
আফ্রিকা সিডিসি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে এই প্রাদুর্ভাবকে আঞ্চলিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে শত শত মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
ইবোলা একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রক্ত, বমি, ঘাম, লালা এবং অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা এবং পরবর্তীতে বমি, ডায়রিয়া ও অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক রক্তক্ষরণ। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে আনা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা। অন্যথায় এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
রেড ক্রসের ব্রুনো মিশনের ভাষায়, "আমরা এখনো মহামারির সবচেয়ে খারাপ সময় দেখিনি। যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে এই প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।"