বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতার খবরে বৈশ্বিক অর্থবাজারে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীরা এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত এই মূল্যবান ধাতুর প্রতি আগ্রহ বাড়ার পেছনে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি মার্কিন মুদ্রানীতি সম্পর্কিত প্রত্যাশাও বড় ভূমিকা রাখছে।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩১৭ দশমিক ৪৩ ডলারে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে টানা চতুর্থ দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে স্বর্ণ। যদিও আগস্ট ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দাম সামান্য কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৩৮ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে এসেছে, তবুও বাজার বিশ্লেষকদের মতে সামগ্রিক প্রবণতা এখনও স্বর্ণের পক্ষেই রয়েছে।

 

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই উত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত প্রাথমিক শান্তি চুক্তিকে। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে দুই দেশ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে উভয় পক্ষই জানিয়েছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা একদিকে সম্ভাব্য স্থিতিশীলতার আশা করছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও মাথায় রাখছেন। ফলে শেয়ারবাজারের পাশাপাশি স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদেও বিনিয়োগ বাড়ছে।

 

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান মেরেক্সের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেয়ার বলেন, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ গত সপ্তাহের শেষ থেকেই স্বর্ণবাজারে নতুন গতি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে।

 

ডলারের দুর্বলতায় বাড়ছে স্বর্ণের আকর্ষণ

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মার্কিন ডলারের দুর্বলতা। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ডলার সূচক ১০ দিনের সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি চলে এসেছে। ডলারের মূল্য কমে গেলে অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার ও স্বর্ণের মধ্যে সাধারণত বিপরীতমুখী সম্পর্ক দেখা যায়। যখন ডলার দুর্বল হয়, তখন স্বর্ণ শক্তিশালী হয় এবং উল্টো অবস্থায় স্বর্ণের বাজার চাপের মুখে পড়ে। বর্তমানে ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণকে বাড়তি সহায়তা দিচ্ছে।

ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্তে নজর বাজারের

 

বিনিয়োগকারীদের চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের দিকে। নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের নেতৃত্বে বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠক। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে।

 

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সুদের হার কমানোর সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়া গেলে স্বর্ণের বাজারে আরও বড় উল্লম্ফন দেখা যেতে পারে। কারণ সুদের হার কমে গেলে বন্ড ও ব্যাংক আমানতের মতো সুদভিত্তিক বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যায়। তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

 

গত কয়েক মাস ধরেই বাজারে আলোচনা চলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করায় ফেড আগামী মাসগুলোতে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থানে যেতে পারে। এই প্রত্যাশাও স্বর্ণের দামকে সমর্থন দিচ্ছে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা অব্যাহত

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম উচ্চ অবস্থানে থাকলেও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ ক্রয় অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে চীন, ভারত, তুরস্ক এবং কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজারকে শক্তিশালী ভিত্তি দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারে মিশ্র চিত্র

স্বর্ণের দাম বাড়লেও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মঙ্গলবার রুপার দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৯ দশমিক ৪২ ডলারে নেমে এসেছে। প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৬২ দশমিক ৩৪ ডলারে। একই সময়ে প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৩৩ দশমিক ১৩ ডলারে নেমে গেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পখাতে চাহিদা এবং বৈশ্বিক উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর এসব ধাতুর দাম অনেক বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় স্বর্ণের মতো একই প্রবণতা সবসময় দেখা যায় না।

 

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ডলারের গতিপ্রকৃতি আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণবাজারের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। যদি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতি অব্যাহত থাকে এবং একই সঙ্গে সুদহার কমানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

 

তবে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেই বিবেচনা করবেন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা। ফলে স্বর্ণবাজারের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।


সম্পর্কিত নিউজ