{{ news.section.title }}
শুক্রবারের আগেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি প্রকাশ হতে পারে : জে ডি ভ্যান্স
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি। কয়েক মাসের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা, হরমুজ প্রণালি সংকট এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পর দুই দেশ এখন একটি সমঝোতা কাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আকারে খুবই সংক্ষিপ্ত। নথিটি প্রায় দেড় পৃষ্ঠার এবং মূলত যুদ্ধ বন্ধ, যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। বিস্তারিত ও জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক আলোচনায় চূড়ান্ত হবে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির পূর্ণ বা আংশিক খসড়া আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই প্রকাশ করতে পারেন। ইতোমধ্যে চুক্তির একটি ডিজিটাল সংস্করণে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা সম্মতি দিয়েছেন বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কী আছে সম্ভাব্য চুক্তিতে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী চুক্তির মূল ভিত্তি চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমত, চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাবে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করবে। ইরানও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না বলে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
চতুর্থত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি পৃথক ও দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এই বিষয়টি বর্তমান এমওইউতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
পারমাণবিক কর্মসূচিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর। মার্কিন প্রশাসন বারবার বলছে, ইরানকে অবশ্যই এমন একটি যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যাতে দেশটি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে। ওয়াশিংটন চায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মাধ্যমে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হোক।
অন্যদিকে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেবে না। এ কারণেই বর্তমান সমঝোতা স্মারককে অনেকেই একটি "ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট" বা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন, চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে নয়।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কীভাবে?
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানকে কোনো আগাম অর্থ দেওয়া হবে না এবং অবরুদ্ধ সম্পদও সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত করা হবে না। বরং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে এবং আন্তর্জাতিক যাচাই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বৈদেশিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর থাকা সীমাবদ্ধতা কমানো হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনঃএকীকরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। কিছু আলোচনায় ইরানের আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার বিষয়ও উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিষয় নয়; এটি পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানি এই পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুদ্ধের সময় প্রণালিতে চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়।
চুক্তির খবর প্রকাশ হওয়ার পরই তেলের বাজারে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই উভয় তেলের দাম কয়েক শতাংশ কমেছে এবং গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ইসরায়েলের অবস্থান কী?
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো ইসরায়েলের ভূমিকা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতোমধ্যেই বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি লেবানন, সিরিয়া এবং গাজা ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলেও জানিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েল বর্তমান আলোচনার সরাসরি অংশ নয়। ফলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা
চুক্তির পেছনে পাকিস্তান ও কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে দুই দেশের মধ্যে একটি শান্তি কাঠামো তৈরিতে ইসলামাবাদ সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কমাতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এখন সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান সমঝোতা কার্যকর হলে এটি শুধু যুদ্ধ বন্ধের পথই খুলবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে সবচেয়ে কঠিন অংশ এখনো বাকি। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইসরায়েলের উদ্বেগ এবং ইরানের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস-এসব ইস্যুতে সমাধান না হলে বর্তমান সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নাও নিতে পারে।
তবুও কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার দিকে এখন নজর রাখছে পুরো বিশ্ব।