যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননের দখল ছাড়বে না ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননের দখল ছাড়বে না ইসরায়েল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতার খবর প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধ থামানোর পথে অগ্রসর হওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং লেবাননকে কেন্দ্র করে ইরান বা তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে নতুন কোনো হামলা হলে ‘পূর্ণ শক্তিতে’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে কাৎজ দাবি করেন, ইসরায়েল কোনো আন্তর্জাতিক চাপ বা কূটনৈতিক সমঝোতার কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনবে না। তার ভাষায়, দক্ষিণ লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজন হলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযানও চলবে।

 

এই অবস্থান এমন এক সময় সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে দুই দেশ যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সমঝোতার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অবরোধ শিথিল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের নতুন আলোচনা শুরুর বিষয় রয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে লেবানন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। এমনকি সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতেও তেহরান লেবানন প্রশ্নকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে।

 

ইরান ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করেছে, চলমান সমঝোতার আওতায় ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত কমানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, লেবানন সংক্রান্ত নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত ইসরায়েল নিজেই নেবে।

 

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো নতুন সমঝোতা নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার জোট সরকারের কট্টর ডানপন্থী নেতারা ইতোমধ্যেই সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেছেন, এই ধরনের কোনো চুক্তি ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচও সমঝোতাকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।

 

অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধের শুরুতে যে লক্ষ্যগুলো সামনে আনা হয়েছিল-ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা, আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন কমানো এবং তেহরানের ওপর আরও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা-সেগুলোর অনেকই বর্তমান সমঝোতায় প্রতিফলিত হয়নি।

 

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপ করেন। তিনি লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানান এবং বলেন, যেকোনো সমঝোতা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে লেবাননের পরিস্থিতিরও সমাধান প্রয়োজন।

 

তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ এসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যাবে না। তার দাবি, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে ‘জিহাদি উপাদান’ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো থেকে মুক্ত রাখতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, লেবাননের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি ইরান সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ শক্তিতে’ পাল্টা আঘাত হানা হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলোও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ও ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শান্তি প্রক্রিয়া আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

জাতিসংঘও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে স্বাগত জানালেও লেবাননে চলমান সামরিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে এবং সমঝোতার শর্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অন্যদিকে লেবাননকে ঘিরে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান-দুইয়ের সংঘাতে আগামী কয়েক সপ্তাহ অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইসরায়েল


সম্পর্কিত নিউজ