{{ news.section.title }}
ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লোভ দেখাচ্ছেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে ঘিরে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। তবে এই সুবিধা পেতে হলে তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অঙ্গীকারসহ চুক্তির সব শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি অর্থনৈতিক প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করছে, যার মাধ্যমে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এটি কোনো সরাসরি মার্কিন আর্থিক সহায়তা নয়। বরং ইউরোপ, এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন শুধু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ই বিবেচনা করছে না, বরং ইরানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা করছে। তবে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না; ইরানকে প্রথমে চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নের প্রমাণ দিতে হবে।
বর্তমান আলোচনায় যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) তৈরি হয়েছে, সেটিকে মূলত একটি প্রাথমিক কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন দফা আলোচনা শুরুর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই বৃহৎ বিনিয়োগ তহবিলের পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে পারে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ ইরানকে দেওয়া হবে না। সম্ভাব্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, শিল্প পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় আকারের অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
তবে পুরো বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন প্রশাসন চায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ওপর কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে এসব উপাদানের ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হতে পারে।
ইরানের পক্ষ থেকেও অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ তেহরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে এই প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, ইরানকে এত বড় অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার আগে তাদের কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি যাচাই প্রয়োজন। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট-উভয় দলের কিছু রাজনীতিকই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই পরে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখিত "ইরানকে সরাসরি ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার" দাবিকে অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো সরকারি অর্থ দেওয়া হবে না; বরং সম্ভাব্য বিনিয়োগ কাঠামো বেসরকারি খাতনির্ভর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু হওয়া, তেল রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমে আসা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ তহবিলের কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের এই পরিকল্পনাকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে, এটি বাস্তব রূপ পাবে কি না।