{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১২০ ডলার, যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে পারে-এমন ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও তীব্রভাবে বেড়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে অল্প সময়ের জন্য ১২২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়। বৃহস্পতিবার সকালেও দাম ১২০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও অস্থির হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থার দ্রুত সমাধানের কোনো ইঙ্গিত না থাকায় তেলের বাজারে নতুন আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ দীর্ঘায়িত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন-এমন খবর বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও জানিয়েছে, ট্রাম্প তার সহযোগীদের ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।
হোয়াইট হাউসে জ্বালানি খাতের শীর্ষদের সঙ্গে বৈঠক
তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থসহ জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল-ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কীভাবে সামাল দেওয়া যায়। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈঠকে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন, ভেনেজুয়েলা, তেলের আগাম বাজার, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জাহাজ চলাচলের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বৈঠক শুধু নিয়মিত শিল্প-পরামর্শের অংশ নয়, বরং হরমুজ প্রণালি ও ইরানবিষয়ক মার্কিন কৌশল দীর্ঘায়িত হতে পারে-এমন সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল-ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং শিল্প জ্বালানির বাজারে চাপ আরও বাড়বে।
হরমুজ প্রণালি কেন বাজারের কেন্দ্রবিন্দু
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পণ্যবাজার পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহঘাটতির কারণে ২০২৬ সালে জ্বালানির গড় দাম ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ১৬ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ইরান হুমকি দিয়েছে, প্রণালির কাছে এলে জাহাজে হামলা হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগামী বা সেখান থেকে আসা জাহাজ আটকানো বা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে জ্বালানি পরিবহন, বীমা ব্যয় ও শিপিং খরচ বেড়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজে জাহাজ চলাচল থমকে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন জোট গঠনের চেষ্টা করছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার বাড়ানো যায়। তবে একই সময়ে ট্রাম্প ইরানগামী ও ইরান থেকে আসা জাহাজের ওপর অবরোধ ধরে রাখার অবস্থান নিয়েছেন।
তেলের দাম কেন এত দ্রুত বাড়ছে
তেলের বাজারে দাম বাড়ার পেছনে শুধু সরবরাহ কমে যাওয়ার বাস্তবতা নয়, ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আতঙ্কও বড় ভূমিকা রাখছে। বাজারে যদি মনে হয় হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক হবে না, তাহলে ক্রেতারা আগেভাগে তেল কিনতে শুরু করেন, বীমা ও পরিবহন খরচ বাড়ে এবং ফিউচার মার্কেটে দাম দ্রুত উঠে যায়।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, অচলাবস্থা এখন দশম সপ্তাহে ঢুকেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় চাপ তৈরি করছে। একই প্রতিবেদনে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সতর্কবার্তা উল্লেখ করা হয়েছে-অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও অনেক ওপরে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ওপর চাপ
হরমুজ সংকটের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা পর্যায়েও পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম গত কয়েক দিনে দ্রুত বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ২৩ ডলারে উঠেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। জ্বালানি খরচ বাড়লে পরিবহন, বিমানভাড়া, খাদ্যপণ্য এবং দৈনন্দিন ব্যয়েও চাপ পড়ে।
এই চাপ রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংবেদনশীল। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জীবনযাত্রার খরচ সরাসরি বাড়ে। ফলে প্রশাসন একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প সরবরাহের পথ খুঁজছে।
ইরানের অর্থনীতিতে গভীর চাপ
অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতিও বড় ধাক্কায় পড়েছে। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষতির কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশে ওঠার কথা জানিয়েছে। রিয়ালের মান রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমেছে এবং যুদ্ধের কারণে প্রায় ২০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চাকরি হারিয়েছেন বলে ইরান সরকার জানিয়েছে।
ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশটিকে “শিগগিরই বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত” নিতে হবে। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সামরিক হামলা পুনরায় শুরু না করেও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে আলোচনায় আনাই এখন ওয়াশিংটনের বড় কৌশল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, সরাসরি হামলা বা পুরোপুরি পিছু হটার উভয় পথেই ঝুঁকি থাকায় অবরোধ দীর্ঘায়িত রাখার কৌশল গুরুত্ব পাচ্ছে।
বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও প্রভাব
তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইউরোপের বাজারে বুধবার পতন দেখা যায়। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক কমেছে, ফ্রান্সের সিএসি ও জার্মানির ডিএএক্স সূচকও দুর্বল হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ মার্কেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম ১২০ ডলারের কাছাকাছি ওঠা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এক্সটিবির গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকসের বিশ্লেষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তার মতে, বাজার এখন ধরে নিচ্ছে ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ থাকতে পারে। সে কারণেই শুধু তেলের বাজার নয়, শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার এবং বন্ডবাজারেও সতর্কতা বাড়ছে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ মে মাসে বড় মাত্রায় থেমে গেলেও ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে পড়ে। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হলে এ অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজার এখন তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে-হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অবরোধ কত দিন ধরে রাখে এবং ইরান আলোচনায় ফিরতে রাজি হয় কি না। যদি অবরোধ দীর্ঘ হয় এবং প্রণালি কার্যত অচল থাকে, তাহলে ব্রেন্টের দাম ১২০ ডলারের ওপরে স্থায়ী হতে পারে। আর সরবরাহ আরও কমে গেলে দাম আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অন্যদিকে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে বাজার দ্রুত কিছুটা ঠান্ডা হতে পারে। এর আগেও ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির খবর ও ইরানের ওপর হামলা সাময়িক স্থগিতের ইঙ্গিতে তেলের দাম কমেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অবরোধ-সংকেত সেই স্বস্তি দ্রুত মুছে দিয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের সম্ভাবনা এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ব্রেন্ট ১২০ ডলার ছাড়ানো শুধু তেলের বাজারের ঘটনা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয়, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের দাম, উন্নয়নশীল দেশের আমদানি খরচ এবং রাজনৈতিক চাপ।
হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক না হলে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে তেলের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। আর সেই অস্থিরতার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানে নয়, বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান