ইরান চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া করবে না যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প

ইরান চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া করবে না যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়ো না করতে নিজের প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (২৪ মে) তিনি বলেন, তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে আলোচনা এগোলেও তার প্রশাসন এখনই কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতির ঘোষণা দিতে চাইছে না।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, চুক্তি সম্পন্ন, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে। তিনি বলেন, উভয় পক্ষকেই সময় নিতে হবে এবং বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। মেরিনলিংকে প্রকাশিত রয়টার্সভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন অবরোধ কার্যকর থাকবে।

 

এর একদিন আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি শান্তি চুক্তির সমঝোতা স্মারক বা সমঝোতা চুক্তিপত্রের বেশিরভাগ অংশ নিয়ে আলোচনা শেষ করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি থাকবে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত।

 

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এগোচ্ছে আলোচনা

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরানে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানও জানায়, যুদ্ধ বন্ধের উপায় নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক তৈরির কাজ চলছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বলেছে, আলোচনায় চূড়ান্ত বোঝাপড়ার দিকে “উৎসাহব্যঞ্জক” অগ্রগতি হয়েছে।

 

রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামো তিন ধাপে এগোতে পারে। প্রথম ধাপে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান, দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধান এবং তৃতীয় ধাপে বৃহত্তর চুক্তি নিয়ে ৩০ দিনের আলোচনার সময়সীমা রাখা হতে পারে, যা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে।

 

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবিত আরেকটি কাঠামোয় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর কথা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, ইরান অবাধে তেল বিক্রি করতে পারবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা চলবে। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি টোল ছাড়া খোলা রাখা, প্রণালিতে স্থাপিত মাইন অপসারণ এবং জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার বিষয়ও রয়েছে।

 

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের তেল বিক্রিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিতে পারে বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

 

ইউরেনিয়াম ইস্যুতে এখনো বড় মতপার্থক্য

তবে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না এবং দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে ফেলতে হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রণালি টোল ছাড়াই খুলতে হবে এবং ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে।

 

কিন্তু রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র বলেছেন, তেহরান এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়নি। ওই সূত্রের ভাষ্য, পারমাণবিক ইস্যুটি প্রাথমিক চুক্তির অংশ নয়; এটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় বিবেচিত হবে। এ কারণে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরান নীতিগতভাবে হরমুজ খুলে দিতে এবং ইউরেনিয়াম ইস্যুতে সমাধানে যেতে রাজি হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

 

ইরানের শর্ত: অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা ছাড় ও অর্থ মুক্তি

ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হলো, ইরান যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

 

ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে এবং বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের তেল আয় ছাড় দিতে হবে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে মেরিনলিংক জানায়, সম্ভাব্য চুক্তির কয়েকটি অংশে এখনো যুক্তরাষ্ট্র বাধা দিচ্ছে বলে ইরানপন্থী সূত্রগুলোর দাবি; এর মধ্যে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের বিষয়টি রয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ছাড় দিতে নারাজ তেহরান

সম্ভাব্য চুক্তির আরেকটি বড় বাধা হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ট্রাম্প দাবি করলেও ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, হরমুজ প্রণালির রুট, সময়, পদ্ধতি ও পারমিট দেওয়ার ক্ষমতা ইসলামিক রিপাবলিকের হাতেই থাকবে। ফার্স আরও দাবি করেছে, চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত-ট্রাম্পের এমন বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় তেহরানের অনুমতি নিয়ে ৩৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এই সংখ্যা এখনও অনেক কম।

 

চুক্তির সম্ভাবনায় তেলের বাজারে স্বস্তি

সম্ভাব্য চুক্তির খবর সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমে। রয়টার্সের বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আশাবাদে তেলের বাজারে চাপ কমেছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি শক্তিশালী হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দ্রুত শেষ হবে না। মেরিনলিংকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির প্রধানের বরাত দিয়ে বলা হয়, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি ফিরতে ২০২৭ সালের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

 

দেশের ভেতরেও চাপের মুখে ট্রাম্প

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসে তার যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগও দেখা গেছে। ফলে সংঘাত বন্ধে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি বারবার সামনে আনছেন ট্রাম্প। মেরিনলিংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে এবং এপ্রিলের শুরু থেকে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।

 

তবে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ বলছেন, এই চুক্তি অনেকটা ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির পুনরাবৃত্তির মতো, যেখান থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেছেন, প্রস্তাবিত কাঠামো মূলত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার মতো। তার মতে, যুদ্ধ শুরু করাই ভুল ছিল; এখন সেই ভুল থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ