হরমুজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

হরমুজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম আবারও লাফিয়ে বেড়েছে। দেশটিতে প্রতি গ্যালন নিয়মিত গ্যাসোলিনের গড় দাম ৪ দশমিক ১৮ ডলারে উঠেছে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৮ ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে গড় দাম ছিল প্রায় ৩ দশমিক ১৫ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতি গ্যালনে প্রায় ১ ডলার বেশি দিতে হচ্ছে মার্কিন চালকদের। গ্যাসবাডি ও এএএ–এর তথ্য উদ্ধৃত করে সিবিএস নিউজও জানিয়েছে, দাম যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জ্বালানির দামে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, তেল উৎপাদন ও রিফাইনারির কাছাকাছি থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোতে দাম তুলনামূলক কম, টেক্সাসে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম প্রায় ৩ দশমিক ৭২ ডলার। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় দাম প্রায় ৫ দশমিক ৯৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। ইনভেস্টোপিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় দাম ৫ দশমিক ৯৭ ডলার ছুঁয়েছে, আর ওকলাহোমায় গড় দাম ছিল ৩ দশমিক ৫৭ ডলার। রাজ্যভেদে কর, পরিবেশগত জ্বালানি নিয়ম, রিফাইনারির দূরত্ব এবং সরবরাহ অবকাঠামোর পার্থক্য এই ব্যবধান তৈরি করছে।

 

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএও বলেছে, ২০২৫ সালে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়েছে, যা সমুদ্রপথে বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

 

এই কারণে হরমুজ প্রণালিতে যে কোনো সামরিক উত্তেজনা, অবরোধ, হামলার আশঙ্কা বা জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া সরাসরি বৈশ্বিক তেলের দামে প্রভাব ফেলে। প্রণালিটি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বড় তেল উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি হয়। ফলে এই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হলে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহ খোঁজে, শিপিং খরচ বাড়ে, বীমা ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়।

 

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। বর্তমান সংকটে সেই সংখ্যা কমে প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ১০টিতে নেমে এসেছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। জাহাজ চলাচলের এই বড় পতন জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনে বড় বাধা তৈরি করছে।

 

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২৭৯টি জাহাজ পার হয়েছে এবং ২২টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি জাহাজ মালিক, ক্রু, বীমা কোম্পানি এবং জ্বালানি আমদানিকারকদের জন্য খরচ ও অনিশ্চয়তা দুই-ই বাড়িয়ে দেয়।

 

ইউরোনিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ সংকটের কারণে প্রায় ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়েছেন। তেল ও গ্যাস ট্যাংকারসহ শত শত কার্গো জাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রণালি পার হতে পারছে না বা অপেক্ষায় রয়েছে।

 

শুধু যুদ্ধ নয়, রিফাইনারি সমস্যাও দাম বাড়াচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ রিফাইনারি সমস্যাও ভূমিকা রাখছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বাজারে সরবরাহ উদ্বেগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রিফাইনারিতে পরিকল্পিত ও আকস্মিক বন্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। এপ্রিলে পরিকল্পিত ও অপ্রত্যাশিত রিফাইনারি বন্ধ মিলিয়ে দিনে ৮ লাখ ব্যারেলের বেশি সক্ষমতা বাজার থেকে বাদ পড়েছে।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফিলিপস ৬৬-এর Wood River refinery, Marathon Petroleum-এর Robinson plant এবং BP-এর Whiting refinery-তে সমস্যা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পড়ছে।

 

অপরিশোধিত তেলের দামও বাড়ছে

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের কাছাকাছি এবং যুক্তরাষ্ট্রের WTI ক্রুডের দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। তেলের দাম বাড়লে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা গ্যাসোলিন, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দামে প্রভাব ফেলে।

 

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, খাদ্য, উৎপাদন ও ভোক্তা পণ্যের খরচও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এটি সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

 

ভোক্তা পর্যায়ে চাপ বাড়ছে

গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের ওপরে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর বাজেটে নতুন চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি চালানো শ্রমজীবী মানুষ, ডেলিভারি কর্মী, ছোট ব্যবসায়ী এবং শহরতলির বাসিন্দারা এই চাপ বেশি অনুভব করছেন। প্রতি গ্যালনে ১ ডলার বাড়তি দাম মানে নিয়মিত গাড়ি ব্যবহারকারীদের মাসিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। ইনভেস্টোপিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে।

 

সংকট দীর্ঘ হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এই রুট দিয়ে তেল ও এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ যায় বলে সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। আইইএ বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প পথ সীমিত। ফলে এই পথের বিঘ্ন বিশ্ব তেলবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম ৪ দশমিক ১৮ ডলারে পৌঁছানো তাই শুধু দেশীয় বাজারের ঘটনা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, শিপিং নিরাপত্তা, রিফাইনারি সক্ষমতা এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওপর তৈরি হওয়া এক যৌথ চাপের প্রতিফলন।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


সম্পর্কিত নিউজ