ইরান যেন পারমাণবিক শক্তিধর না হয়, রাজা চার্লসও তাতে একমত : ট্রাম্প

ইরান যেন পারমাণবিক শক্তিধর না হয়, রাজা চার্লসও তাতে একমত : ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, রাজা চার্লস এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না-এমন অবস্থানে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসও তার সঙ্গে একমত বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে ব্রিটিশ রাজপরিবার সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় না-এ কারণে ট্রাম্পের মন্তব্য কূটনৈতিক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার রাতের ওই white-tie state dinner-এ ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র “খুব ভালো” করছে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, রাজা চার্লসও তার এই অবস্থানের সঙ্গে একমত। তবে চার্লস নিজের বক্তব্যে ইরান বা চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ সরাসরি তোলেননি।

রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে কূটনৈতিক চাপ রয়েছে। ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় যথেষ্ট সমর্থন না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। এর মধ্যেই ব্রিটিশ রাজাকে ইরান-সংক্রান্ত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

 

চার্লসের ভাষণে ছিল ঐক্যের বার্তা, ইরান প্রসঙ্গ নয়

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরের অংশ হিসেবে কংগ্রেসে ভাষণ দেন রাজা চার্লস। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ৩৫ বছরের মধ্যে এটিই ছিল কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যের মার্কিন কংগ্রেসে প্রথম ভাষণ। সেখানে চার্লস যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক “special relationship”, ন্যাটোর গুরুত্ব, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তবে তিনি ইরান বা ট্রাম্পের নীতির সরাসরি উল্লেখ করেননি।

কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ৯/১১ হামলার কথাও স্মরণ করেন চার্লস। তিনি বলেন, সে সময় যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল এবং এখনো আছে। তার বক্তব্যে পশ্চিমা মিত্রদের ঐক্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ এড়ানোর বার্তা ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

বাকিংহাম প্যালেসের সতর্ক প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের মন্তব্যের পর বাকিংহাম প্যালেস সতর্ক অবস্থান নেয়। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজা চার্লস এবং ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে। তবে প্যালেস সরাসরি বলেনি যে রাজা ট্রাম্পের নির্দিষ্ট মন্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে একমত হয়েছেন।

রয়টার্সও জানিয়েছে, ব্রিটিশ দূতাবাস রাজা চার্লসের মতামত সম্পর্কে প্রশ্ন বাকিংহাম প্যালেসে পাঠিয়েছে। প্যালেসের অবস্থান মূলত যুক্তরাজ্যের প্রচলিত নীতির ধারাবাহিকতা-ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করে, তবে রাজাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে না আনা।

 

কেন বিষয়টি সংবেদনশীল

ব্রিটেনের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রাজা বা রানি সাধারণত দলীয় রাজনীতি ও সরাসরি নীতিগত বিতর্ক থেকে দূরে থাকেন। রাষ্ট্রীয় সফরে তারা কূটনৈতিক ঐক্য, ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও প্রতীকী বার্তা দেন; কিন্তু নির্দিষ্ট যুদ্ধ, সামরিক অভিযান বা বিতর্কিত পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে-বিপক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া বিরল। এ কারণেই ট্রাম্পের বক্তব্য রাজপরিবারের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে।

ইরান ইস্যুও নিজেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে তেহরান বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির অধীনে অধিকারভুক্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে।

 

সফরের কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট

রাজা চার্লসের চার দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা চলছে। দ্য গার্ডিয়ানের ভাষায়, সফরটি কূটনৈতিকভাবে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনায় যুক্তরাজ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে প্রশংসা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনের কিছু অবস্থান নিয়ে তার অসন্তোষ প্রকাশ্য হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন সম্পর্ককে শক্তিশালী বলে তুলে ধরেন। অন্যদিকে চার্লসও দুই দেশের সম্পর্ক, ঐতিহাসিক বন্ধন ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তবে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের মন্তব্য পুরো সফরের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে বোঝানো হয়েছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার প্রশ্নে রাজা চার্লসও তার অবস্থান সমর্থন করেন। কিন্তু চার্লস নিজে প্রকাশ্যে ইরান নিয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি। বাকিংহাম প্যালেসও বিষয়টি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে না দেখিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘদিনের নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেই তুলে ধরেছে।

ফলে ঘটনাটি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নয়, রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং ওয়াশিংটন-লন্ডন কূটনীতির সূক্ষ্ম সীমারেখাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


সম্পর্কিত নিউজ