{{ news.section.title }}
হরমুজ প্রণালির মাইন অপসারণে বাইরের কারও সাহায্য লাগবে না: ইরান
হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা দেশটির নিজস্বভাবেই রয়েছে এবং বাইরের শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মঙ্গলবার তেহরানে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইরান নিজ দায়িত্ব ও দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। তাই হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অন্য কোনো পক্ষের অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরান নিজস্ব সামর্থ্য ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীতমুখী রুটে ৬০ দিনের জন্য নিরাপদ চলাচল সুবিধা বিনামূল্যে প্রদান করা হবে।
বাঘাই আরও বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে পুনরায় শুরু হবে এবং কারিগরি প্রতিবন্ধকতা, সামরিক ঝুঁকি ও মাইন অপসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তা চলমান থাকবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।’
ইরানের এই অবস্থান এমন এক সময় সামনে এলো, যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা দেন যে ফ্রান্স ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত ও মাইন অপসারণে কাজ করবে। প্যারিসে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে বৈঠকের পর মাখোঁ বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ ও শর্তহীন নৌচলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট জানান, অন্যান্য অংশীদার দেশগুলোর সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রক্রিয়াও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তেহরান এই উদ্যোগকে সতর্কতার সঙ্গে দেখছে এবং মনে করছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা উপকূলীয় দেশগুলোর হাতেই থাকা উচিত।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, অস্থায়ী নৌব্যবস্থা এবং মাইন নিষ্ক্রিয়করণের বিষয়গুলো সাম্প্রতিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। সেই অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বয় করবে ইরান।
এদিকে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামুদ্রিক করিডরগুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানকার যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শত শত জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়ে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়।
পরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আবারও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কেবল সামরিক নয়, কূটনৈতিক সমাধানও জরুরি। ইরানের একক নিয়ন্ত্রণের দাবি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর যৌথ নিরাপত্তা উদ্যোগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে ভবিষ্যতে নতুন উত্তেজনা দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বীমা কোম্পানি এবং শিপিং খাত হরমুজ পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। কারণ প্রণালিটির পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরতে এখনো সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।