ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৫০০, ধ্বংসস্তূপে এখনও নিখোঁজ হাজারো মানুষ

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৫০০, ধ্বংসস্তূপে এখনও নিখোঁজ হাজারো মানুষ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির রাজধানী কারাকাস, লা গুয়াইরা এবং উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য শহরে গত চার দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলগুলো এখনও ধসে পড়া ভবন, আবাসিক এলাকা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আজও আমরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার করেছি, একই সঙ্গে জীবিত মানুষও পাওয়া গেছে। আমাদের অভিযান শিগগিরই শেষ হচ্ছে না।’


রদ্রিগুয়েজ আরও বলেন, অনেক পরিবার এখনও বিশ্বাস করছে তাদের স্বজনরা ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন। সেই আশাকে সামনে রেখেই উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো।


গত ২৪ জুন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং দ্বিতীয়টির মাত্রা ৭.৫। দুটি কম্পনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড।


ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল উত্তর ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চল, যার প্রভাব রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হয়। প্রতিবেশী কলম্বিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, আরুবা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।


ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টের স্পিকার জর্জ রদ্রিগুয়েজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৫০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আহত অবস্থায় অন্তত ৩ হাজার ১৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৭৭৪টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


রাজধানী কারাকাসের বহু বহুতল ভবন, সরকারি স্থাপনা, শপিং সেন্টার এবং আবাসিক এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে লা গুয়াইরা, মিরান্দা, আরাগুয়া এবং রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।


ভেনেজুয়েলার সরকারি টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী, দমকল বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে কাজ করছে। অনেক এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে।


ইউএসজিএসের প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় মৃতের সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে চূড়ান্ত প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।


ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলের বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দেলসি রদ্রিগুয়েজ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হবে।


দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চাপ দ্রুত বাড়ছে। কারাকাসের কয়েকটি হাসপাতাল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।


বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, এখনও অন্তত ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকতে পারেন। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও বলছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বহু এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি।


জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস, প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার দুর্বল অবকাঠামো, পুরোনো ভবন এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-প্রতিরোধী মানদণ্ড অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়েছে।


ভূমিকম্পের পর থেকে দেশটিতে শত শত আফটারশকও রেকর্ড করা হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েকদিন আরও মাঝারি বা শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের নয়, বরং লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


সম্পর্কিত নিউজ