বিশ্ববাজারে স্বর্ণ-রুপার দামে পতন

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ-রুপার দামে পতন
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণ ও রুপার দাম কমেছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার নীতি এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ জুন) এশীয় লেনদেনে স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ০.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬১ দশমিক ৩৫ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে আগস্ট ডেলিভারির জন্য মার্কিন গোল্ড ফিউচার্স ০.৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৬ দশমিক ৪০ ডলারে। এর ফলে টানা চতুর্থ মাসের মতো স্বর্ণের মাসিক দরপতনের পথে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার। চার মাসে মূল্যবান এই ধাতুর মোট দরপতন প্রায় ১০.৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নীতির দিকে ফিরে যাওয়ায় বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ছে।

 

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, সপ্তাহের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও বাজার এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারকে। তাঁর মতে, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, যা ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে উৎসাহিত করবে।

 

রোববার ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বাড়তে শুরু করে।

 

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করা হলে ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্যও বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

 

তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গন থেকে ইতিবাচক কিছু খবরও এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। এই খবরের কারণে বিনিয়োগকারীদের একাংশ ধারণা করছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা বেশি উদ্বিগ্ন ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে। কারণ সুদের হার বৃদ্ধি পেলে বন্ড ও ডলারে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে এবং সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়।

 

শুধু স্বর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামও কমেছে। স্পট সিলভারের মূল্য ১.১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৮.৫১ ডলারে নেমে এসেছে। শিল্পখাতে রুপার চাহিদা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ বাজারে প্রভাব ফেলেছে।

 

অন্যদিকে প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। স্পট প্লাটিনামের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৬৩০.১৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্যালাডিয়ামের মূল্য ০.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ২১৮.৯২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অটোমোবাইল শিল্পে চাহিদা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত উদ্বেগ এসব ধাতুর দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

 

বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণ থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড এবং ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।

 

এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ৭৭ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় তিনটি বিষয় কাজ করছে-মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নীতি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে ফেডারেল রিজার্ভের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের অগ্রগতি স্বর্ণ ও তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ