{{ news.section.title }}
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ফের যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তেহরানের হাতে থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে যেকোনো সামরিক হামলা বা উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার এক বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক চাপ সৃষ্টি বা নতুন হামলার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট এবং তেহরান নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
আরাঘচি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রয়েছে। এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক অভিযান বা চাপ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে এবং এর দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষকেই নিতে হবে।’
তার এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন গত কয়েকদিনে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, কিশম দ্বীপ, সিরিক এবং বান্দর-ই লেংগেহ এলাকায় মার্কিন বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এসব অঞ্চলের কয়েকটি সামরিক ও নজরদারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। যদিও তেহরান এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি।
এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি। ইরানের দাবি, তাদের অনুমতি ছাড়া কিছু জাহাজ নির্ধারিত রুট ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল এবং নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বে ব্যবহৃত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও সুইজারল্যান্ডে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা সত্ত্বেও হরমুজ প্রশ্নে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে রয়েছে। ওয়াশিংটন চায় আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ওমান উপকূল ঘেঁষে নিরাপদ করিডর ব্যবহার করুক, কিন্তু তেহরান উত্তর দিকের জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে।
এদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও (UKMTO) এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। কয়েকটি বাণিজ্যিক কোম্পানি ইতোমধ্যে বিকল্প রুট ব্যবহারের বিষয়েও চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ‘৩০ দিনের নিয়ন্ত্রণ’ সংক্রান্ত বক্তব্য মূলত একটি কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে তেহরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করতে চাইছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাতে চাইছে যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা প্রশ্নে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন এখন পর্যন্ত আরাঘচির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক তেলবাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো নতুন সামরিক সংঘর্ষ বা জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।