একদিন পর আবারও পাকিস্তানে ভূমিকম্প

একদিন পর আবারও পাকিস্তানে ভূমিকম্প
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে একদিনের ব্যবধানে আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর আগে শুক্রবার একই অঞ্চলে ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। পরপর দুই দিনের এই ভূকম্পন বেলুচিস্তানজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্পন কেন্দ্র (ইএমএসসি), জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) এবং ভলকানো ডিসকভারির তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল বেলুচিস্তানের বিস্তীর্ণ পার্বত্য অঞ্চল, যেখানে জনবসতি তুলনামূলক কম হলেও ভূমিকম্পের কম্পন বহু এলাকায় অনুভূত হয়।

 

ভূমিকম্পের পরপরই কোয়েটা, কোহলু, সিবি, ডেরা বুগতি এবং আশপাশের কয়েকটি জেলায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা স্থানে বেরিয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক এলাকায় মানুষ রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন এবং সম্ভাব্য আফটারশকের আশঙ্কায় ভবনের ভেতরে ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন।

 

প্রাথমিকভাবে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া না গেলেও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পাকিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) এবং বেলুচিস্তান প্রাদেশিক প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

 

এর মাত্র একদিন আগে শুক্রবার বিকেলে বেলুচিস্তানের কোহলু জেলার কাছে ৫ দশমিক ১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগের তথ্যমতে, ওই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল কোহলু শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার গভীরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর শনিবারের শক্তিশালী কম্পন একই ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার অংশ হতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক ভূকম্পন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের গভীরতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে একই অঞ্চলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ভূমিকম্প ভবিষ্যতে আরও আফটারশকের আশঙ্কা তৈরি করছে।

 

পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান আরব, ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় নিয়মিত ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশেষ করে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া, গিলগিট-বালতিস্তান এবং কাশ্মীর অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই ভূ-তাত্ত্বিক চাপের কারণেই পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ঘন কম্পন সৃষ্টি হয়। বেলুচিস্তান প্রদেশে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে রেখেছে।

 

পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি হয়েছিল ২০০৫ সালে কাশ্মীর অঞ্চলে। ৭ দশমিক ৬ মাত্রার সেই ভূমিকম্পে প্রায় ৮৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া ২০২১ সালে বেলুচিস্তানের হারনাই জেলায় ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভেনেজুয়েলা, জাপান, ফিলিপাইন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূমিকম্পের পর পাকিস্তানে পরপর দুই দিনের এই কম্পন আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক মহলেও নজর কেড়েছে।

 

পাকিস্তানের আবহাওয়া বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসকারীদের প্রয়োজন ছাড়া ভবনের ভেতরে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বেলুচিস্তানের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরপর দুই দিনের এই কম্পন দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।


সম্পর্কিত নিউজ