মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ‘নরকে পরিণত’ করার হুমকি ইরানের

মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ‘নরকে পরিণত’ করার হুমকি ইরানের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা চলমান থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ‘নরকে পরিণত’ করার হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তেহরান।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের উপকূলীয় বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর আইআরজিসির নৌ ইউনিট কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বাহিনীটি বলেছে, সিরিক শহরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারেনি’ এবং তেহরান এখনো ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিজেদের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

 

আইআরজিসির নৌ-কমান্ড আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্দেশনা উপেক্ষা করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

 

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিষয় আলাদা। আগামী দিনগুলোতে সেগুলোকে নরকে পরিণত করা হবে।’

 

এর কিছুক্ষণ পর বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কসংকেত জারি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানায় এবং নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলে। সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করারও অনুরোধ জানানো হয়।

 

আরও পড়ুন: জুলাই থেকে বড় পরিসরে শিক্ষক নিয়োগ শুরু: শিক্ষামন্ত্রী

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এবং আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতের আলি আল সালেম মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের রাজধানী মানামার পোর্ট সালমানে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

 

আইআরজিসি জানিয়েছে, ইরানের পাঁচটি উপকূলীয় সামরিক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। রয়টার্সকে দেওয়া এক মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান কুয়েত, বাহরাইন ও আশপাশের অঞ্চলের দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয় এবং এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

 

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

 

এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার জবাবে ইরানের ১০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন ঘাঁটি, যোগাযোগ কেন্দ্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা।

 

গত কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয় এবং সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনাগুলো এগিয়ে চললেও সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলা সেই প্রক্রিয়াকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন চাইছে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ওমান উপকূলের নিরাপদ রুট ব্যবহার করুক। অন্যদিকে তেহরান হরমুজের উত্তর অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় এবং তাদের নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

 

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানি সাময়িকভাবে উপসাগরীয় রুটে চলাচল সীমিত করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষ এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাইছে। তবে হরমুজ প্রণালি, মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ