মার্কিন মধ্যস্থতার চুক্তি মানছে না হিজবুল্লাহ, বলছে ‘আত্মসমর্পণ’

মার্কিন মধ্যস্থতার চুক্তি মানছে না হিজবুল্লাহ, বলছে ‘আত্মসমর্পণ’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন নিরাপত্তা চুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির প্রধান নাইম কাসেম এই চুক্তিকে ‘ইসরায়েলের কাছে আত্মসমর্পণ’ হিসেবে বর্ণনা করে একে ‘বাতিল ও অকার্যকর’ ঘোষণা করেছেন। তার এই অবস্থানের ফলে বহু মাস ধরে চলা সংঘাত বন্ধে শুরু হওয়া নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা আলোচনার পর শুক্রবার লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা একটি নিরাপত্তা কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে একটি ‘প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

 

চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকায় ধীরে ধীরে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে এবং কিছু এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাবে। তবে একটি সম্প্রসারিত নিরাপত্তা অঞ্চলে আপাতত ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান করতে পারবে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

 

হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, এই চুক্তি লেবাননের সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, লেবাননের সরকার একতরফাভাবে ছাড় দিয়েছে এবং দেশের স্বার্থকে দুর্বল করেছে। তার মতে, ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা ‘সব লাল রেখা অতিক্রম করেছে’।

 

তিনি আরও বলেন, হিজবুল্লাহ তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে। তার ভাষায়, সবচেয়ে কঠিন সময়েও তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না।

 

চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিন পরই দক্ষিণ লেবাননে আবারও ইসরায়েলি ড্রোন হামলা চালানো হয়। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকায় এই হামলা হয়। ঘটনাটি সেই এলাকায় ঘটেছে যা ইসরায়েলের ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চলের বাইরের অংশ হিসেবে বিবেচিত।

 

ইসরায়েলের দাবি, হামলায় এমন একজনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে যিনি তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিলেন। তবে এই হামলা নতুন চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

 

লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এই চুক্তি নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু হিজবুল্লাহ নয়, দেশটির প্রভাবশালী শিয়া রাজনৈতিক দল আমাল আন্দোলনও এই চুক্তির সমালোচনা করেছে। লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির নেতৃত্বাধীন দলটি বলেছে, এই চুক্তি ভারসাম্যপূর্ণ নয় এবং এটি ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করবে।

 

বেইরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহ সমর্থকদের বিক্ষোভও দেখা গেছে। অনেকেই চুক্তিকে লেবাননের জন্য অপমানজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

 

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এই কাঠামো ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে সাময়িকভাবে অবস্থান করার সুযোগ দিচ্ছে এবং উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শনিবার একটি মানচিত্র প্রদর্শন করেন যেখানে দুটি তথাকথিত ‘পাইলট জোন’ দেখানো হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে একটি অঞ্চল বর্তমান ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাইরে এবং অন্যটি নতুন সম্প্রসারিত নিরাপত্তা অঞ্চলের প্রান্তে অবস্থিত।

 

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় সামরিক সমন্বয় ব্যবস্থা গঠন করা হবে। একই সঙ্গে লেবাননের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবেও অর্থ সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছেন, এই চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, লেবাননের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে কোনো ধরনের অংশীদারিত্ব গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বর্তমান সংঘাতে এক মিলিয়নেরও বেশি লেবানিজ নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের বহু শিয়া পরিবার এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ফিরে যাওয়া নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও চুক্তির কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আদালত বা অন্যান্য আইনি ফোরামে পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি স্বল্পমেয়াদে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হলেও মূল সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণে রাজি নয়, ইসরায়েল নিরাপত্তা অঞ্চল ছাড়তে অনিচ্ছুক এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও অত্যন্ত জটিল।

 

হিজবুল্লাহ বহুবার বলেছে, ইসরায়েল সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের সমঝোতা মেনে নেবে না। সংগঠনটির মতে, ইসরায়েলি উপস্থিতি অব্যাহত থাকলে সশস্ত্র প্রতিরোধও অব্যাহত থাকবে।

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননের সরকার মনে করছে, ধাপে ধাপে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিলে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। তবে হিজবুল্লাহর বিরোধিতা এবং চলমান সামরিক হামলার কারণে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ বিরোধের প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই নতুন চুক্তি এখন আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ সত্যিই শান্তির পথ খুলবে, নাকি নতুন সংঘাতের সূচনা করবে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ