ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ১,৪৩০, নিখোঁজ ৫১ হাজারের বেশি

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ১,৪৩০, নিখোঁজ ৫১ হাজারের বেশি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে শক্তিশালী দুই ভূমিকম্প। দেশটির উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আঘাত হানা এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। এখনো ৫১ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিত মানুষদের খুঁজে বের করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে উদ্ধার অভিযান।

 

বুধবার আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী কম্পনের কারণে উপকূলীয় লা গুয়াইরা, রাজধানী কারাকাস এবং আশপাশের বহু এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

লা গুয়াইরায় ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজারো মানুষ

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে লা গুয়াইরা অঞ্চলে। অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক জায়গায় সরকারি উদ্ধার দল পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ নিজেদের হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের কান্না ও সাহায্যের আর্তনাদ বহু এলাকায় এখনো শোনা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

 

৭২ ঘণ্টার সংকটময় সময় দ্রুত শেষ হচ্ছে

আন্তর্জাতিক উদ্ধার বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির ভেনেজুয়েলা পরিচালক নিকোল কাস্ট বলেন, এখন উদ্ধার অভিযান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। অনেক মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

 

এলাকায় প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ

শুক্রবার রাত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রবেশ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি অনুমতি ছাড়া লা গুয়াইরা এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অনিয়ন্ত্রিত জনসমাগম এবং যানজট উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছিল। তবে স্থানীয় অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী না থাকায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

 

ধ্বংসস্তূপে খালি হাতে উদ্ধার অভিযান

বহু এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতির অভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ইট, পাথর এবং কংক্রিট সরিয়ে নিজেদের স্বজনদের খুঁজছেন। অনেকেই কোদাল, হাতুড়ি বা শুধুমাত্র খালি হাত ব্যবহার করছেন। জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, প্রতিটি জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা এখন অলৌকিক ঘটনার মতো। তিনি বলেন, এই বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র জনগণের কাছ থেকে লুকানো হবে না।

 

আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে

ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে দেশটিতে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি উদ্ধার দলের অন্তত ১ হাজার ৬০০ সদস্য উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি, তাঁবু এবং চিকিৎসা সরঞ্জামও পাঠানো হচ্ছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

জাতিসংঘের আশঙ্কা: লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শুধু রাজধানী কারাকাসেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই দুর্যোগের প্রভাবের মধ্যে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হতে পারেন। সংস্থাটির মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

 

হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থা চাপে

ভূমিকম্পের পর আহত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। অনেক হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আহতদের মধ্যে হাড় ভাঙা, মাথায় আঘাত, রক্তক্ষরণ এবং চাপা পড়ে থাকার কারণে নানা জটিলতা দেখা যাচ্ছে।

 

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ

মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট সেবা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ এখনো তাদের স্বজনদের অবস্থান জানতে পারছেন না। অনেক পরিবার জানতেই পারছে না তাদের প্রিয়জন জীবিত আছেন নাকি নিহত হয়েছেন। কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ নিখোঁজ স্বজনদের ছবি হাতে নিয়ে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং উদ্ধার শিবিরে ঘুরছেন।

 

নতুন ভূমিকম্পে আতঙ্ক আরও বেড়েছে

শনিবার আরাগুয়া উপকূলে ৪ দশমিক ৮ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যদিও এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আতঙ্কিত মানুষ আবারও ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন স্বাভাবিক ঘটনা।

 

অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার

জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। বহু সড়ক, সেতু, সরকারি ভবন, স্কুল, হাসপাতাল এবং আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলার জন্য এই ক্ষতি বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।

 

রাজনৈতিক পরিস্থিতিও জটিল

দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, সরকার পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করছেন, প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা এখনো অপ্রতুল।

 

মানুষ এখনও ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছে

আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বহু মানুষ এখনও তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ভবনগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তা, খোলা মাঠ এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাচ্ছেন। শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে

স্বাধীন ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ এখনও চলমান। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

 

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই ভূমিকম্পকে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হাজারো পরিবার এখন স্বজন হারানোর শোক, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচে কাউকে জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের অনুসন্ধান অভিযান চলবে।

 

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ