ইরানের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: সেন্টকম

ইরানের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: সেন্টকম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এএফপি

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অন্যদিকে তেহরান এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি ও চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির আশপাশে অবস্থিত ইরানের অন্তত ১০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ড্রোন সংরক্ষণাগার, নজরদারি অবকাঠামো, উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

 

সেন্টকমের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আকাশ থেকে ধারণ করা বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওতে বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও আগুনের দৃশ্য ধরা পড়ে। মার্কিন বাহিনী একে ‘বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, পানামার পতাকাবাহী এম/টি কিকু (M/T Kiku) নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ড্রোন হামলার পর এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ট্যাংকারটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

 

এর আগে বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এম/ভি এভার লাভলি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজও হরমুজ প্রণালির কাছে ড্রোন হামলার শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।

 

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কেশম ও সিরিক এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কিছু এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।

 

গত দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক জাহাজ হামলা এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের কারণে সেই শান্তি প্রক্রিয়া নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

 

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, মার্কিন হামলা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফল হিসেবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ভবিষ্যতে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

 

এরই মধ্যে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনাগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগও উঠেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

 

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান কার্যত এই নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং শত শত জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।

 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ওমান উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ দিকের নিরাপদ করিডর ব্যবহার করুক। কিন্তু ইরান উত্তর দিকের রুটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজে তেহরানের নির্দেশনা অমান্য করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালি, জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়ে গেছে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও জটিল আকার নিতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ