হরমুজে উত্তেজনা নতুন মোড়ে, মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি আইআরজিসির

হরমুজে উত্তেজনা নতুন মোড়ে, মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি আইআরজিসির
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এএফপি

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জবাবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে বাহিনীটি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা যদি আবারও আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে আরও কঠোর ও ব্যাপক।

শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি বার্তায় আইআরজিসি জানায়, ‘শত্রুপক্ষের যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হয়েছে এবং আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হলে প্রতিক্রিয়া আরও বিস্তৃত হবে।’

 

এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা প্রক্রিয়া বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

 

হরমুজে জাহাজে হামলার পর পাল্টা আঘাত

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই জাহাজে হামলার জন্য ইরান দায়ী।

 

মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণ কেন্দ্র, উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক নৌপরিবহন নিরাপদ রাখা এবং ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধ করা।

 

অন্যদিকে তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা প্রক্রিয়ার সরাসরি লঙ্ঘন।

 

‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ বললেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইরান যদি সমঝোতার শর্ত মেনে না চলে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।

 

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, ‘সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।’

 

ভেঙে পড়ছে শান্তি আলোচনার আশা

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং নতুন কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি করার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু নতুন এই হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই প্রক্রিয়া বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা চূড়ান্ত কোনো চুক্তি ছিল না; বরং এটি ছিল একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। ফলে মাঠপর্যায়ে সামান্য উত্তেজনাও পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন শঙ্কা

বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। গত কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেক জাহাজ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে এবং বীমা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে।

 

মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে উদ্বেগ

আইআরজিসি অতীতে কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার দাবি করেছিল। যদিও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশ তখন জানিয়েছিল যে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

 

নতুন সংঘাতের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে কেউই আগ্রহী নয়। তবে হরমুজ প্রণালি, বাণিজ্যিক জাহাজ ও সামরিক ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে সীমিত সংঘর্ষের ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।

 

এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। মার্কিন ও মিত্রবাহিনী হরমুজ অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং নতুন কোনো হামলার আশঙ্কায় নৌ চলাচল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ