ভেনেজুয়েলার পর এবার জাপানে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প

ভেনেজুয়েলার পর এবার জাপানে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেশ কাটতে না কাটতেই জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে আঘাত হেনেছে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে ইওয়াতে প্রিফেকচারের উপকূলীয় এলাকায় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রাজধানী টোকিওসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

জাপান আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) জানায়, ভূমিকম্পটির প্রাথমিক মাত্রা ৬ দশমিক ৯ নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ২ করা হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইওয়াতে উপকূলের পূর্বদিকে সমুদ্রের নিচে এবং এর গভীরতা ছিল প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

 

অন্যদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ভূমিকম্পটির মাত্রা ৬ দশমিক ৯ বলে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও সবাই একমত যে এটি উত্তর-পূর্ব জাপানে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী কম্পন।

 

জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে সুনামির আশঙ্কা নেই। ফলে উপকূলীয় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো নির্দেশনা জারি করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য আফটারশকের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার সকালের ব্যস্ত সময়ে ভূমিকম্পটি আঘাত হানায় সেনদাই, মোরিওকা, আওমোরি এবং হোক্কাইদোর কিছু এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ অফিস, বিদ্যালয় ও বাসাবাড়ি থেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন।

 

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি টোকিওতে সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের জরুরি প্রতিক্রিয়া দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছি। প্রয়োজন হলে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হবে। সবাইকে আফটারশকের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

 

সরকারের শীর্ষ মুখপাত্র মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসন অবকাঠামো, সড়ক, সেতু ও ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

আওমোরি প্রিফেকচারের হাশিকামি শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোমোকো নাগানে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভূমিকম্প সতর্কবার্তা জারি হওয়ার সময় তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং মাঝারি মাত্রার দুলুনি অনুভব করেন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে উপস্থিত অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কে কান্না শুরু করে। পরে সব ক্লাস বাতিল করে শিশুদের নিরাপদে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 

জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের ফুটেজে সেনদাই, মোরিওকা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে মানুষকে খোলা স্থানে অবস্থান করতে দেখা গেছে। যদিও বেশিরভাগ এলাকায় ভবন ধসে পড়া বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য দেখা যায়নি।

 

নিরাপত্তাজনিত কারণে ইস্ট জাপান রেলওয়ে কোম্পানি (জেআর ইস্ট) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে রেলপথ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সেতুগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু হয়।

 

জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ফুকুশিমা দাইইচি ও অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনায় জরুরি পরীক্ষা চালায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো অস্বাভাবিকতা কিংবা তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।

 

গত ডিসেম্বরে উত্তর-পূর্ব জাপানে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহব্যাপী ‘মেগা-ভূমিকম্প সতর্কতা’ জারি করা হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরে নানকাই ট্রাফ অঞ্চলে ভবিষ্যতে একটি বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা বলে আসছেন।

 

জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

 

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের মাত্র একদিন পর জাপানে এই কম্পন বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত জাপানে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ