বিশ্ব বাজারে আরও কমেছে জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ব বাজারে আরও কমেছে জ্বালানি তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় চার মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বুধবার এশিয়ার শুরুর দিকের লেনদেনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম প্রায় ০.৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬.৭১ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে মঙ্গলবারও ব্রেন্টের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্চ মাসের পর এটিই সর্বনিম্ন অবস্থানের অন্যতম।

 

মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দামও একইভাবে কমেছে। বুধবার সকালে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমে আসায় বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়াই বাজারে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক এবং শান্তি আলোচনার অগ্রগতিও তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

 

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছানোর পর তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করলে বহু তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়ে এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। সে সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায় বলে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।

 

জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা, তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) সম্প্রতি জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ওপেক প্লাসভুক্ত কয়েকটি দেশ উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করছে এবং অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে আসার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোমবার একদিনেই অন্তত ৩৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ দৈনিক চলাচল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

তবে অনেক বিশ্লেষক এখনো সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি এবং যেকোনো নতুন সামরিক উত্তেজনা আবারও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

 

গোল্ডম্যান স্যাকস এবং জেপি মরগানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি না পেলে তেলের দাম আগামী কয়েক সপ্তাহে ৭০ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে দাম আবার দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

 

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওপর।

 

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ