{{ news.section.title }}
আগামী ১৫ বছরের মধ্যে মিসরের সঙ্গে যুদ্ধ হতে পারে: ইসরায়েল
ইসরায়েলের প্রভাবশালী ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী ও জায়নবাদী অধিকারকর্মী আমিয়াদ কোহেন দাবি করেছেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ হতে পারে। তার মতে, ইরান এবং তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে সুন্নি রাজনৈতিক আন্দোলন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো।
জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত জিউইশ নিউজ সিন্ডিকেট (জেএনএস) ইন্টারন্যাশনাল পলিসি সামিটে বক্তব্য দিতে গিয়ে কোহেন বলেন, “১৫ বছর পর ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের যুদ্ধ হবে। মুসলিম ব্রাদারহুড একসময় মিসরের নিয়ন্ত্রণ নেবে।” তার এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
আমিয়াদ কোহেন বর্তমানে হেরুত সেন্টারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিগত প্রস্তাব দিয়ে আসছে।
ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কোহেন বলেন, এতদিন শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন সুন্নি রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।
তিনি বিশেষভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘এক নম্বর হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, এই সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করতে চায়।
নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে কোহেন ইঙ্গিত দেন যে, পশ্চিমা সমাজেও ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও তিনি এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
কোহেনের বক্তব্যে তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ভূমিকা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক একাধিকবার উত্তেজনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, জেরুজালেম ইস্যু এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা গেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান একাধিকবার ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কোহেনের বক্তব্য ইসরায়েলের কিছু ডানপন্থী নিরাপত্তা মহলে ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে ইরানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুরস্ক ও মিসরকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত মাসে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ডও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়ে গেলে তুরস্ক ও মিসরই ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
তবে বাস্তব চিত্র এখনো অনেকটাই ভিন্ন। ১৯৭৯ সালে ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
গত চার দশকে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত সমন্বয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে সিনাই অঞ্চলে জঙ্গি দমনে কায়রো ও তেল আবিবের মধ্যে নিরাপত্তা সমন্বয় বহুবার আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হয়েছে।
মিসরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে এবং ২০১৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোহেনের বক্তব্য মূলত একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিশ্লেষণ, যা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। এটি ইসরায়েলের বর্তমান সরকারি নীতি বা সামরিক কৌশলের আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন নয়।
এদিকে গাজা যুদ্ধ, লেবানন পরিস্থিতি, ইরান ইস্যু এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ডানপন্থী মহলের একটি অংশ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নতুনভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানাচ্ছে।
কোহেন তার বক্তব্যের শেষদিকে বলেন, “ইসরায়েলকে এমন এক ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যেখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ আসবে শিয়া গোষ্ঠী নয়, বরং সুন্নি রাজনৈতিক শক্তি ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে।”
তিনি আরও বলেন, “ইসরায়েলকে শক্তিশালী হতে হবে, আমেরিকাকেও শক্তিশালী হতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমেরিকা দুর্বল হয়ে পড়ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের বক্তব্য নতুন ভূরাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিলেও মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: জিউইশ নিউজ সিন্ডিকেট (JNS), জেরুজালেম পোস্ট