{{ news.section.title }}
ইরান সমঝোতা না মানলে ‘যা করা দরকার, তাই করার’ হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন, তেহরান যদি সমঝোতার শর্ত না মেনে চলে কিংবা তাদের আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে ওয়াশিংটন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “যদি ইরান সমঝোতার শর্ত না মানে কিংবা তাদের আচরণ ঠিকঠাক না থাকে; তবে আমার যা করা দরকার, আমি সেটাই করব।” এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা ১৪ দফার অন্তর্বর্তী সমঝোতা বাস্তবায়ন নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজ নিজ দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের পর দুই দেশ এই সমঝোতায় পৌঁছায়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে এই চুক্তিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুরু থেকেই চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় করছে, সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ইরান যেন খাদ্যপণ্য ক্রয় করতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা যে অর্থ ছাড় করছি, তা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্য কেনার জন্য ব্যবহার হবে। দেশটির ৯ কোটিরও বেশি মানুষ রয়েছে, কিন্তু তারা নিজেদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এই অর্থ শেষ পর্যন্ত আমাদের কৃষকদের কাছেই ফিরে আসবে।”
কিন্তু তেহরান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি তাসনিম সংবাদ সংস্থাকে বলেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনার কোনো বাধ্যবাধকতা ইরানের নেই। তিনি বলেন, জব্দ অর্থ শুধু খাদ্য বা কৃষিপণ্য নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা অন্যান্য পণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এই মতপার্থক্যই এখন দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ইরানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে ৬০ দিনের জন্য শিথিল করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন অর্থ বিভাগ একটি বিশেষ সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে, যার মাধ্যমে ইরানি তেল বিক্রি, পরিবহন, বীমা ও আর্থিক লেনদেনের ওপর সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সবচেয়ে জটিল বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে-ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তিনি সম্প্রতি বলেন, “চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ইরানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।” কিন্তু ইরানি কর্মকর্তারা এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এখনও চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। এই ইস্যুতেই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। ইসরায়েল ইতোমধ্যে এই সমঝোতা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তেল আবিবের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে আবারও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে পারে। এদিকে মার্কিন রাজনীতির ভেতরেও ট্রাম্পের এই সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। তারা মনে করছেন, ইরানকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হলে দেশটি পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি অংশও সমঝোতা নিয়ে বিভক্ত অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক রিপাবলিকান ভোটার যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে থাকলেও উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন, ইরানের কাছ থেকে আরও বড় ছাড় আদায় করা উচিত ছিল।
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে চলমান আলোচনা এখন পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালি এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
তবে লেবাননে সংঘাত, ইসরায়েলের অবস্থান এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে পুরো প্রক্রিয়া এখনো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুমকিমূলক বক্তব্যের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উভয় পক্ষই অগ্রগতির কথা বলছে। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
তিনি আগেও বলেছিলেন, “যদি তারা ঠিকভাবে আচরণ না করে, তাহলে আমরা আবারও তাদের ওপর বোমা ফেলব।” সাম্প্রতিক বক্তব্যেও তিনি একই ধরনের কঠোর অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তেল রপ্তানি এবং জব্দ সম্পদ ছাড়ের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে এখনো গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হবে নাকি নতুন করে আরেকটি বড় সংকটের সূচনা করবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স