কাতারের গ্যাস স্থাপনায় বিস্ফোরণ, নিখোঁজ ১৮

কাতারের গ্যাস স্থাপনায় বিস্ফোরণ, নিখোঁজ ১৮
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী দেশ কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে অবস্থিত বারজান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৫৪ জন আহত হয়েছেন এবং আরও ১৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রোববার (২২ জুন) সন্ধ্যায় স্থানীয় সময় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কাতার কর্তৃপক্ষ এটিকে একটি ‘প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা’ (টেকনিক্যাল অ্যাক্সিডেন্ট) হিসেবে বর্ণনা করলেও এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণের পরপরই পুরো এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

 

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিস্ফোরণের পরপরই আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

 

ঘটনার তীব্রতা এতটাই ছিল যে রাস লাফান থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী দোহার বিভিন্ন এলাকায়ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাদের বাড়ির জানালাগুলো কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দূর থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে।

 

বারজান গ্যাস সরবরাহ প্রকল্প কাতারের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প থেকে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন খাতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি এখান থেকে ইথেন, কনডেনসেট, এলপিজি এবং সালফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপপণ্য উৎপাদিত হয়, যা দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা হয়।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বিস্ফোরণের ফলে যদি স্থাপনাটির বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে কাতারের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। যদিও রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি এখন পর্যন্ত স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেনি।

 

এই দুর্ঘটনার পেছনে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মার্চ মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনার সময় কাতারও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। সেই সময় রাস লাফান কমপ্লেক্সের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটে আঘাত হানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।

 

কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবি সে সময় রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ওই হামলায় দেশটির এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

 

রাস লাফান শিল্পনগরী শুধু কাতারের নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। এখানেই অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো। বর্তমানে এই কমপ্লেক্সের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন।

 

বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কাতার অন্যতম। ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু দেশ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কাতারের গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাস লাফানে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা উৎপাদন বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ছিল। দেশটির এলএনজি রপ্তানির প্রায় পুরো অংশই এই নৌপথ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে। বিকল্প কোনো কার্যকর রপ্তানি রুট না থাকায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাকালে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কার্যত আটকে যায়।

 

পরবর্তীতে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হয় এবং বিশ্ববাজারে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে থাকে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাস লাফানের সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ নতুন করে বাজারে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

 

মার্চ মাসের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর কাতারএনার্জি নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে অফশোর গ্যাসক্ষেত্র এবং অনশোর প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলো থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। যদিও তখন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।

 

সাম্প্রতিক বিস্ফোরণটি ঘটেছে ঠিক সেই সময়, যখন ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটগুলোর কার্যক্রম ধীরে ধীরে পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষক মনে করছেন, পুনরায় উৎপাদন শুরু করার সময় প্রযুক্তিগত জটিলতা বা অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

 

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাতারের মতো একটি কৌশলগত জ্বালানি কেন্দ্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও জ্বালানির দামে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো কাতারি এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

 

এদিকে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। একই সঙ্গে নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ