সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং লেবানন যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ-এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে রেখে সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই বৈঠককে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত আলোচনার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।

পাকিস্তানি সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তিনি পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। পাকিস্তান সরকার এই আলোচনাকে ইসলামাবাদে শুরু হওয়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে।

 

সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নের তীরে অবস্থিত বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোপনীয় আলোচনার জন্য তারা প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যদিও অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

 

অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। তার কার্যালয় জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনই এই সফরের মূল লক্ষ্য। ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেছেন, লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে এখনও উদ্বেগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে এবং কূটনৈতিক পথেই সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

এই আলোচনা এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা কাঠামোকে বাস্তবায়নের জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা চলছে। ওই কাঠামোর আওতায় উভয় দেশ সামরিক উত্তেজনা কমানো, আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।

 

তবে আলোচনার পথ মোটেও সহজ নয়। গত কয়েকদিনে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠক স্থগিতও হয়েছিল। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও আশঙ্কা করছে, লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে আরও বিস্তৃত পরিদর্শন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে। অপরদিকে তেহরান তার সার্বভৌম অধিকার এবং বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর জোর দিয়ে আসছে। ফলে এই বিষয়ে সমঝোতা অর্জনই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন অংশ হতে পারে।

 

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে, অন্যদিকে ইরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রশ্নও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাচ্ছে।

 

পাকিস্তানের ভূমিকাও এবার বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ইসলামাবাদ শুরু থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনিরকে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

 

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বুর্গেনস্টকের এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নাও আসতে পারে। তবে পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তি তৈরি হলে সেটিকেই বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হবে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনা অব্যাহত থাকাটাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ