যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় প্রতিদিন গড়ে একটি শিশু হত্যা করেছে ইসরাইল: ইউনিসেফ

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় প্রতিদিন গড়ে একটি শিশু হত্যা করেছে ইসরাইল: ইউনিসেফ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু ও দুর্ভোগ থামেনি বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, যে সময়টি শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার কথা ছিল, সেই সময়েও অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে শিশুরা হামলা, গুলিবর্ষণ, বাস্তুচ্যুতি এবং চিকিৎসা সংকটের মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

শুক্রবার (১৯ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও গড়ে প্রায় প্রতিদিনই অন্তত একজন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

 

জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, “যে সময়টি সংযম এবং সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত ছিল, সেই সময়েও আট মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু নিহত হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব এখন যুদ্ধবিরতির ভাষা নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু গাজার পরিবারগুলো এখনো তাদের সন্তানদের দাফন করছে। যুদ্ধবিরতি যদি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই যুদ্ধবিরতির অর্থ কী?”

 

‘নিষ্ঠুর বিভ্রম’ হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিরতি

ইউনিসেফের মতে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজার বাস্তবতা ভিন্ন। বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ এবং গুলির ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যত একটি “নিষ্ঠুর ও মারাত্মক বিভ্রমে” পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

 

জেমস এল্ডার বলেন, শিশুদের জন্য বাড়ি, স্কুল, খেলার মাঠ এমনকি তাঁবুও নিরাপদ নয়। তারা ফুটবল খেলতে গিয়ে, মাছ ধরতে গিয়ে কিংবা পরিবারের সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করলেও হামলার শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর শত শত শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আটকে আছে হাজারো শিশু

মানবিক সংকট আরও গভীর করেছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়াবহ অবস্থা। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। আহত শিশুদের অনেককে জরুরি অস্ত্রোপচার কিংবা পুনর্বাসন সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইউনিসেফ জানিয়েছে, বহু শিশুকে জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। কিন্তু সীমান্ত ও চলাচল সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, আহত শিশুদের ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, অঙ্গচ্ছেদ এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

 

শুধু শারীরিক নয়, ভয়াবহ মানসিক সংকটও

গাজার শিশুদের মানসিক অবস্থাও ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইউনিসেফের মতে, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, পরিবার হারানো এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার কারণে শিশুরা গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে।

 

জেমস এল্ডার বলেন, “গাজার শিশুদের জন্য ভয়, ক্ষতি এবং সহিংসতা এখন আর ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়। এগুলো তাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।”

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন যুদ্ধের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আচরণগত সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে

 

যুদ্ধবিরতির পরও নিহত এক হাজারের বেশি মানুষ

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও এই তথ্য প্রকাশ করেছে। একই সময়ে গাজার বহু এলাকায় ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ এবং গুলির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে।

 

শিশুদের জন্য ‘নিরাপদ স্থান’ নেই

ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন, গাজায় এখন এমন কোনো স্থান নেই যেখানে শিশুদের পুরোপুরি নিরাপদ বলা যায়। স্কুল ধ্বংস হয়েছে, হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, খেলাধুলার মাঠ নিশ্চিহ্ন, আর আশ্রয়শিবিরগুলোও বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বলছে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু গাজার পরিস্থিতি সেই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান

ইউনিসেফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, সরকার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, কেবল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে শিশুদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

সংস্থাটির ভাষায়, কোনো যুদ্ধবিরতিকেই সফল বলা যায় না যদি সেখানে প্রতিনিয়ত শিশুদের মৃত্যু ঘটে।

 

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু।

 

গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ইউনিসেফের এই সতর্কবার্তা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে-যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য এখনো দিচ্ছে শিশুরাই। তাদের জন্য যুদ্ধবিরতি এখনো কেবল একটি শব্দ, বাস্তবতা নয়।

 

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ