বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা পাকিস্তানের

বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা পাকিস্তানের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আবারও বঙ্গোপসাগরে নিজেদের নৌ উপস্থিতি জোরদারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির নৌবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনের সহায়তায় নির্মিত নতুন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন বহর পাকিস্তানকে বঙ্গোপসাগরে কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপ শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টারও অংশ।

সম্প্রতি পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ সাবমেরিন নির্মাণ করেছে চীন। সাবমেরিনটি ইতোমধ্যে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত বা কমিশন করা হয়েছে। সাবমেরিনটি চীন থেকে পাকিস্তানে নিয়ে আসার দায়িত্বে থাকা নৌবাহিনীর কর্মকর্তা কমোডর ওমর ফারুক ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে শ্রীলঙ্কার দৈনিক দ্য মর্নিং–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন অন্তর্ভুক্তির ফলে পাকিস্তান বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে।

 

কমোডর ফারুক বলেন, “পিএনএস হ্যাঙ্গর সিরিজের আরও সাতটি সাবমেরিন পর্যায়ক্রমে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যুক্ত হবে। এই সাবমেরিনগুলো বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের উপস্থিতি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”

 

তার এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ ১৯৭১ সালের আগে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর কার্যক্রম ছিল সক্রিয়। সে সময় পাকিস্তানের বহরে থাকা ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ নামের একটি সাবমেরিন ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট আইএনএস খুকরিকে ডুবিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পরাজয়ের পর কার্যত বঙ্গোপসাগর থেকে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

গত পাঁচ দশক ধরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর মূল কার্যক্রম আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশকেন্দ্রিক ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে ইসলামাবাদ নতুন করে সাবমেরিন সক্ষমতা গড়ে তুলছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিনগুলো চীনের টাইপ-০৩৯বি বা ইউয়ান-শ্রেণির সাবমেরিন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এসব সাবমেরিনে এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার ফলে সেগুলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করতে পারে এবং শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। আধুনিক টর্পেডো, অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত সোনার ব্যবস্থাও এসব সাবমেরিনে সংযোজিত রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা।

 

বঙ্গোপসাগর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, গভীর সমুদ্রবন্দর, সামুদ্রিক সম্পদ এবং কৌশলগত নৌপথের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই জলরাশি।

 

বিশেষ করে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে আসছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ কমান্ডের সদর দপ্তর বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত। এছাড়া আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, যা মালাক্কা প্রণালির দিকে নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বঙ্গোপসাগরকে ভারত তার নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

 

এমন বাস্তবতায় পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তার প্রকাশ্য মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এটি সরাসরি কোনো সামরিক মোতায়েনের ঘোষণা না হলেও ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করে।

 

দ্য মর্নিংকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কমোডর ওমর ফারুক নতুন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিনকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, পাকিস্তান মোট আটটি হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন বহরে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে বৃহত্তর চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবেও দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন শুধু পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনই সরবরাহ করছে না, বরং যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নেও সহযোগিতা করছে।

 

তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বঙ্গোপসাগর কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত জলসীমা নয়। উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর বিশেষ অধিকার ভোগ করে। কিন্তু এর বাইরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিদেশি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের চলাচল বৈধ এবং স্বীকৃত।

 

ফলে আইনগতভাবে পাকিস্তানি সাবমেরিন বা যুদ্ধজাহাজের বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি নিষিদ্ধ নয়। তবে বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সম্ভাব্য সাবমেরিন উপস্থিতি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমানে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট মোতায়েন পরিকল্পনার সময়সূচি ঘোষণা করেনি, তবুও কমোডর ওমর ফারুকের বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইসলামাবাদ বঙ্গোপসাগরকে আবারও তার কৌশলগত পরিসরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।

 

সূত্র: দ্য মর্নিং, বার্ড মেরিটাইম


সম্পর্কিত নিউজ