{{ news.section.title }}
আত্মসমর্পণের মতই ইরানের সাথে চুক্তি করতে হচ্ছে ইউএসকে
দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের অবসানের পথে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের (MoU) খসড়া থেকে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN-এর হাতে আসা ১৪ দফার ওই খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির পুনরায় উন্মুক্তকরণ, ইরানের ওপর থেকে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং তেহরানের পক্ষ থেকে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যদিও স্মারকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। CNN জানিয়েছে, তারা একজন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে এর একটি কপি পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে নথিটি দেখেছেন এমন এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই কূটনৈতিক সূত্রও এর বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, CNN-এর হাতে থাকা খসড়াটি চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারকের প্রকৃত প্রতিফলন নয়। অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমও ফাঁস হওয়া খসড়াগুলোকে ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেছে।
খসড়া অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই উভয় পক্ষ যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করবে এবং ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা শক্তি প্রয়োগ না করার অঙ্গীকার করবে। এতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথাও বলা হয়েছে।
স্মারকের চতুর্থ ও পঞ্চম ধারায় হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানও একই সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করবে। এই অর্থায়নের কাঠামো চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে।
নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
এছাড়া সমঝোতা স্মারকে ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে বর্তমানে তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত খসড়ায় উল্লেখ নেই। বিষয়টি পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
খসড়ার দশম ধারায় বলা হয়েছে, স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেবে। এর আওতায় ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এছাড়া ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ধীরে ধীরে মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এসব অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে।
স্মারক অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা শেষ করার চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে পারস্পরিক সম্মতিতে সময়সীমা বাড়ানো যাবে। চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থাও গঠন করা হবে।
CNN জানিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকে ইতোমধ্যে ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিটিতে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
চূড়ান্ত চুক্তি হলে তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪টি দফা পড়ুনঃ
১। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র, বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্রদের সঙ্গে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করছে এবং অঙ্গীকার করছে যে, এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদ এবং বাকি অনুচ্ছেদগুলোর বিধান নিশ্চিত করা হবে।
২। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করছে।
৩। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
৪। এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল পূর্ণ সক্ষমতায় পুনরুদ্ধার করা হবে। জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ইরানের ক্ষেত্রে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের অনুপাতে ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আশপাশের অঞ্চল থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করছে।
৫। এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যাতে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ইরানের মাধ্যমে মাইন নিষ্ক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
৬। যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে এবং এর জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।
৭। যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর বর্তমানে বিদ্যমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) বোর্ড অব গভর্নরসের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে আরোপিত সব প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র পুনর্ব্যক্ত করছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে যে, সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত পারস্পরিকভাবে সম্মত অন্যান্য সব বিষয়, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনও অন্তর্ভুক্ত, চূড়ান্ত চুক্তিতে যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধান নিশ্চিত করা হবে।
৯। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে যে, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না কিংবা অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করবে না।
১০। যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও তাদের উপজাত রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র প্রদান করবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১। যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, চূড়ান্ত চুক্তির দিকে আলোচনার অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে সম্পূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। এসব অর্থ মূল হিসাবে সংরক্ষিত থাকুক বা স্থানান্তরিত হোক, তা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর অর্থপ্রদানে ব্যবহার করা যাবে এবং সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব অনুমতি ও লাইসেন্স প্রদান করবে।
১২। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে যে, চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে এর প্রতি প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবায়ন তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩। এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর এবং এর ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর, এবং এসব পদক্ষেপের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র কেবল অবশিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনায় অংশ নেবে।
১৪। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
সংবাদটি সিএনএন থেকে নেয়া