{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ল
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক দিনের টানাপোড়েন শেষে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে স্বর্ণের দাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনও অনিশ্চয়তা বিরাজ করায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তেলের দামের ওঠানামা, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মূল্যবান ধাতুর বাজারে নতুন করে প্রভাব ফেলছে।
বুধবার (১৭ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৯ মিনিটে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৪৭ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচারস ০ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৬৪ দশমিক ৭০ ডলারে লেনদেন হয়। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এটি স্বর্ণের বাজারে পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
মাত্র কয়েক দিন আগেও স্বর্ণের দাম প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ধারণা করতে শুরু করেন যে ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার আরও বাড়াতে পারে। সাধারণত উচ্চ সুদহার স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক, কারণ স্বর্ণ কোনো সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। ফলে বিনিয়োগকারীরা তখন বন্ড বা অন্যান্য সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি এবং শান্তিচুক্তির কাঠামো নিয়ে অগ্রগতির ঘোষণা দেয়। দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালি খুলে গেলে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হলে জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও হ্রাস পাবে। এর ফলে ফেডের আগ্রাসী সুদহার বৃদ্ধির প্রয়োজন কমে যেতে পারে। এই প্রত্যাশাই সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজারে নতুন করে ক্রেতা টানছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ধাতুবাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, তেলের দাম কমা এবং ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করছে।
তবে বিনিয়োগকারীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। কারণ শান্তিচুক্তির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রশাসনও জানিয়েছে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হলে সামরিক উত্তেজনা আবারও ফিরে আসতে পারে। ফলে বাজারে সতর্ক অবস্থান বজায় রয়েছে।
ইতালির বৃহৎ ব্যাংক ইন্টেসা সানপাওলোর অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েলা করসিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজারে কিছুটা চাপ দেখা দিতে পারে। তার মতে, ২০২৬ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে স্বর্ণ ও রুপার দামে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্বর্ণের গড় মূল্য প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে।
তবে অন্যদিকে অনেক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনও স্বর্ণের প্রতি আশাবাদী। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অব্যাহত স্বর্ণ ক্রয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক ঋণ সংকটের আশঙ্কা আগামী কয়েক বছর স্বর্ণের চাহিদাকে শক্তিশালী রাখবে। কিছু বিশ্লেষক ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্বর্ণের বাজারকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকার পূর্বাভাসও দিয়েছেন।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম ০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭০ দশমিক ৩০ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৭৮২ দশমিক ২৩ ডলারে নেমে এসেছে। প্যালাডিয়ামের দামও ০ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৪৯ দশমিক ৩৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম ইতিহাসের উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৭ টাকা রয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণের দামের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার সিদ্ধান্তের ওপর। এসব বিষয়ে সামান্য পরিবর্তনও বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা তৈরি করতে পারে।