{{ news.section.title }}
কী সেই চুক্তি, যার কারণে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে না ভারত-পাকিস্তান?
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যখন ক্রমশ নতুন মাত্রা পাচ্ছে, তখন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে সংঘাত, ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে সতর্ক করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বারবার সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, এ ধরনের হামলা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চল এবং কখনও কখনও একাধিক দেশের জন্যও ভয়াবহ মানবিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাড়ে তিন দশক ধরে কার্যকর থাকা একটি চুক্তি আবারও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় এসেছে। কারণ, একাধিক যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ইস্যু এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ কখনো একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি।
এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ১৯৮৮ সালে স্বাক্ষরিত ‘Agreement on the Prohibition of Attack against Nuclear Installations and Facilities’ বা পারমাণবিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর হামলা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর সরকারের আমলে।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও সে সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস বিরাজ করছিল, তবুও উভয় দেশ উপলব্ধি করেছিল যে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা পুরো অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
চুক্তিটি ১৯৯১ সালের ২৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। এর মূল শর্ত অনুযায়ী, কোনো পক্ষই অপর পক্ষের পারমাণবিক স্থাপনা বা অবকাঠামো ধ্বংস, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা নাশকতার উদ্দেশ্যে হামলা চালাবে না। শুধু তাই নয়, কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এমন হামলা পরিচালনা বা সমর্থন করাও চুক্তির আওতায় নিষিদ্ধ।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য অংশ হলো প্রতিবছর পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময়। ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ভারত ও পাকিস্তান একে অপরকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরবরাহ করে। এরপর থেকে প্রতি বছরের ১ জানুয়ারি নিয়মিতভাবে এই তথ্য বিনিময় হয়ে আসছে।
২০২৬ সালে দুই দেশ টানা ৩৫তম বারের মতো এই তালিকা বিনিময় করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এটি একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তালিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, জ্বালানি উৎপাদন ইউনিট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামোর তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনার সময় এসব স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কে উভয় দেশই অবগত থাকে এবং ভুলবশত বা পরিকল্পিত হামলার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই বর্তমানে ঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে প্রায় ১৮০টি এবং পাকিস্তানের কাছে প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়লেও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বিষয়ে এই মৌলিক সমঝোতা এখনো অটুট রয়েছে।
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক বড় সামরিক সংঘাত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ, ২০০১ সালের সংসদ হামলা-পরবর্তী উত্তেজনা, ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর সংকট, ২০১৬ সালের উরি হামলা, ২০১৯ সালের বালাকোট সংঘাত এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনা-কোনো ক্ষেত্রেই পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালেও চার দিনব্যাপী সামরিক সংঘর্ষ হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ও উভয় পক্ষ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। এটি চুক্তিটির কার্যকারিতা ও পারস্পরিক সংযমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক সৈয়দ আকবরউদ্দিনের মতে, এই ব্যবস্থা শুধু একটি চুক্তি নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার কাঠামো। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই খারাপ হোক না কেন, উভয় দেশ বুঝতে পেরেছে যে পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া মানে নিজেদের জনগণকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সামরিক ঘাঁটি বা অস্ত্রাগারে হামলার ক্ষতি সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাস, নদী ও সমুদ্রপথে শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।
বিশ্ব ইতোমধ্যেই চেরনোবিল এবং ফুকুশিমা দুর্ঘটনার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। যদিও সেগুলো সামরিক হামলার ফল ছিল না, তবুও সেসব ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তা কীভাবে পরিবেশ, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল অনুযায়ী, এমন স্থাপনায় হামলাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইএইএও বহু বছর ধরে পারমাণবিক অবকাঠামোকে সামরিক সংঘাতের বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
বর্তমান সময়ে এই আলোচনা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এটি বারবার সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একইভাবে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের মতো স্থাপনাগুলোও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামলা ও নাশকতার অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান চুক্তি সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা সমাধান করেনি। কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো বিদ্যমান। তবুও চুক্তিটি দেখিয়েছে যে গভীর বৈরিতার মধ্যেও কিছু মৌলিক নিরাপত্তা স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, বর্তমান বিশ্বের জন্য ভারত-পাকিস্তানের এই চুক্তি একটি কার্যকর ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার’ বা আস্থাবর্ধক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে পারমাণবিক অবকাঠামো সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে এই মডেল অনুসরণ করে অনুরূপ সমঝোতা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো বড় লঙ্ঘন ছাড়াই চুক্তিটি কার্যকর থাকা প্রমাণ করে যে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নীতি রক্ষা করা সম্ভব। যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্রমশ যুদ্ধ ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে, তখন ভারত-পাকিস্তানের এই অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায় পরিণত হয়েছে।