রাশিয়া থেকে ২০টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার কিনছে ইরান, কেন নজর এই চুক্তিতে?

রাশিয়া থেকে ২০টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার কিনছে ইরান, কেন নজর এই চুক্তিতে?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ

রাশিয়ার কাছ থেকে ২০টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার কিনতে যাচ্ছে ইরান। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের জন্য করা এই চুক্তিকে দেশটির ত্রাণ, উদ্ধার ও রসদ সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মস্কোতে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি সই করেছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও রুশ প্রতিনিধি দল।

নতুন হেলিকপ্টারগুলো মূলত ত্রাণ কার্যক্রম, দুর্গত এলাকায় রসদ সরবরাহ, জরুরি উদ্ধার অভিযান এবং অগ্নিনির্বাপণ সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। এ কারণে চুক্তিটি শুধু একটি সাধারণ আকাশযান কেনা নয়, বরং ইরানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই চালানের প্রথম চারটি হেলিকপ্টার পাবে তেহরান। বাকি হেলিকপ্টারগুলো কবে, কোন ধাপে এবং কত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে, চুক্তির মোট আর্থিক মূল্যও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

 

আলোচিত এমআই-১৭১ হেলিকপ্টারগুলোতে উন্নত নাইট ভিশন প্রযুক্তি থাকবে। ফলে রাতের অন্ধকারেও উদ্ধার, ত্রাণ ও পরিবহন অভিযান চালানো তুলনামূলক সহজ হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতিতে রাতের অভিযান অনেক সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই জায়গায় এই প্রযুক্তি ইরানের জন্য বাস্তব সুবিধা এনে দিতে পারে।

 

শুধু তাই নয়, হেলিকপ্টারগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামও যুক্ত করা হবে। এর ফলে এগুলো বনাঞ্চল বা দুর্গম এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ, জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ত্রাণ ও সিভিল ডিফেন্স ধরনের অপারেশনে এই সক্ষমতা বিশেষভাবে কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।

 

এমআই-১৭১ মূলত বহুমুখী পরিবহন হেলিকপ্টার শ্রেণির একটি মডেল, যা বিভিন্ন দেশে উদ্ধার, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা সহায়তা এবং জরুরি অপারেশনে ব্যবহার করা হয়। ইরানের মতো ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত, পাহাড়ি ও আংশিক মরুভূমি অধ্যুষিত দেশে এমন হেলিকপ্টার দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেখানে সড়কপথে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন, সেখানে আকাশপথের সহায়তা অনেক বেশি কার্যকর।

 

ইরানের জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে দেশটির পুরোনো আকাশযান বহর নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের বিমান ও হেলিকপ্টার খাতে নতুন যন্ত্রাংশ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়েছে। এর প্রভাব বেসামরিক বিমান চলাচল থেকে শুরু করে উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত আকাশযান পর্যন্ত পড়েছে। ২০২৪ সালে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পর দেশটির বিমান নিরাপত্তা ও পুরোনো বহর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

 

সেই প্রেক্ষাপটে ২০টি নতুন এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্তকে ইরানের জন্য বাস্তব সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রেড ক্রিসেন্টের মতো সংস্থার হাতে আধুনিক হেলিকপ্টার গেলে বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ঘটনা বা সীমান্তবর্তী দুর্গম অঞ্চলে জরুরি সহায়তা পাঠানো অনেক দ্রুত হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য, আশ্রয় উপকরণ এবং উদ্ধারকর্মী পরিবহনেও এই আকাশযান বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

 

এই চুক্তি রাশিয়া ও ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকটিও সামনে আনছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। যদিও এই হেলিকপ্টার চুক্তির ঘোষিত ব্যবহার ত্রাণ ও রসদ সরবরাহকেন্দ্রিক, তবু এটি দুই দেশের বাস্তব সহযোগিতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

 

চুক্তির মোট ব্যয় কত, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা কীভাবে হবে, পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণ কতটা বিস্তৃত হবে, এবং পুরো বহর সরবরাহ শেষ হতে কত সময় লাগবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তারপরও আপাতত এটুকু স্পষ্ট, রাশিয়া থেকে ২০টি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার কেনার মাধ্যমে ইরান তার ত্রাণ, উদ্ধার ও জরুরি লজিস্টিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করতে চাইছে।


সম্পর্কিত নিউজ