যুক্তরাজ্যে ট্রেন সংঘর্ষে চালক নিহত, আহত ৮৯

যুক্তরাজ্যে ট্রেন সংঘর্ষে চালক নিহত, আহত ৮৯
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ড শহরের কাছে ভয়াবহ ট্রেন সংঘর্ষে এক ট্রেনচালক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৮৯ জন যাত্রী। আহতদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন, ২২ জন গুরুতর আহত এবং আরও ৫৬ জন তুলনামূলকভাবে কম আহত হয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ২০টিরও বেশি অ্যাম্বুলেন্স, একাধিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, বিশেষ উদ্ধারকারী দল, ফায়ার সার্ভিস এবং ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করে।

 

কীভাবে ঘটল সংঘর্ষ?

ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ের (EMR) দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন এই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। একটি ট্রেন স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে নটিংহ্যাম থেকে লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অন্যটি বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে করবি থেকে একই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

 

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিকেল প্রায় ৫টা ১৫ মিনিটে বেডফোর্ডের দক্ষিণে এলস্টো (Elstow) এলাকার কাছে একটি ট্রেন অন্য ট্রেনটির পেছনে গিয়ে ধাক্কা দেয়। ট্র্যাকিং ডেটা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সামনের ট্রেনটি কোনো কারণে থেমে গিয়েছিল অথবা গতি কমিয়েছিল, আর পেছনের ট্রেনটি সেটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

 

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ব্রিটেনের রেল দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা (RAIB) ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। সিগন্যালিং ত্রুটি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কিংবা মানবিক ভুল-সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

চালকের মৃত্যুতে শোক

দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তি ছিলেন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ট্রেনগুলোর একটির চালক। ব্রিটেনের রেল কর্মী ইউনিয়ন RMT জানিয়েছে, নিহত চালক দীর্ঘদিন রেল খাতে কর্মরত ছিলেন এবং ইউনিয়নের সাবেক প্রতিনিধিও ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রেল খাতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দুর্ঘটনায় নিহত চালকের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি উদ্ধারকর্মীদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।

 

যাত্রীদের বর্ণনায় বিভীষিকাময় মুহূর্ত

দুর্ঘটনার সময় ট্রেনে থাকা যাত্রীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার ভয়াবহ চিত্র।

 

পিটার ন্যাপ নামের এক যাত্রী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হঠাৎ করেই তিনি নিজের আসন থেকে ছিটকে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন। অনেককে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়। কেউ কেউ আঘাতের কারণে কথা বলার অবস্থায়ও ছিলেন না।

 

আরেক যাত্রী জানান, দুর্ঘটনার আগে কোনো ধরনের সতর্কতা, হর্ন বা ট্রেনের গতি কমার লক্ষণ তিনি টের পাননি। হঠাৎ প্রবল ধাক্কায় সবাই সামনে ছিটকে পড়েন।

 

হাসপাতালগুলোতে জরুরি সতর্কতা

আহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় হাসপাতালগুলো জরুরি সতর্কতা জারি করে। বেডফোর্ড হাসপাতাল এবং লুটন অ্যান্ড ডানস্টেবল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল সাধারণ মানুষকে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জরুরি বিভাগে না আসার অনুরোধ জানায়, যাতে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।

 

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গুরুতর আহতদের মধ্যে মাথা, মেরুদণ্ড এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জটিল আঘাতের ঘটনা রয়েছে। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে করে বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে।

 

রেল যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন

দুর্ঘটনার পর লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশনগামী এবং সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া বহু ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বেডফোর্ড ও লুটনের মধ্যবর্তী রুট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং যাত্রীদের ভ্রমণ স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ে জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু রুটে দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি দেখা দিতে পারে। বিকল্প বাস সার্ভিস চালুর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

 

দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর দুর্ঘটনার একটি

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, দ্য টাইমস, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এবং এপি জানিয়েছে, এটি এই শতাব্দীতে যুক্তরাজ্যের মূল রেল নেটওয়ার্কে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। একই সঙ্গে গুরুতর আহতের সংখ্যার দিক থেকে এটি প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

রেল দুর্ঘটনা তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছেন। ট্রেনের ব্ল্যাক বক্স, সিগন্যালিং সিস্টেম, যোগাযোগ রেকর্ড এবং ট্র্যাকের প্রযুক্তিগত অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

 

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত-শুক্রবারের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা যুক্তরাজ্যের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এবং দেশজুড়ে রেল খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জোরালো করেছে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ