সুইজারল্যান্ড বৈঠক স্থগিত, অনিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রক্রিয়া

সুইজারল্যান্ড বৈঠক স্থগিত, অনিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রক্রিয়া
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা বহুল আলোচিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-ওয়াশিংটন ও তেহরান কি সত্যিই একটি স্থায়ী সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে, নাকি সাময়িক বিরতির পর আবারও উত্তেজনা ফিরে আসবে?

সুইস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে নির্ধারিত আলোচনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আলোচনা পুনরায় শুরু হলে সুইজারল্যান্ড মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

 

যে বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারত

১৯ জুনকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত বুর্গেনস্টক রিসোর্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা শুরু করবেন। এই বৈঠক ছিল একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে পরবর্তী রূপরেখা নির্ধারণের কথা ছিল।

 

কিন্তু শেষ মুহূর্তে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যানসের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত হওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়াই থমকে যায়। পরে হোয়াইট হাউসও নিশ্চিত করে যে, সফরটি আপাতত হচ্ছে না।

 

ভার্চুয়াল স্বাক্ষরের পরই শুরু হয় নতুন প্রশ্ন

ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে ১৮ জুন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতা স্মারক ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানানো হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যানস এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ভার্চুয়াল স্বাক্ষরের পর থেকেই প্রশ্ন ওঠে, যদি মূল নথিতে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সরাসরি বৈঠকের প্রয়োজন কতটুকু?

 

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এখান থেকেই আলোচনার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে।

 

ইরানের সন্দেহ এখনো কাটেনি

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। তেহরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ মনে করে, অতীতেও বিভিন্ন সময় আলোচনার পাশাপাশি সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে শুধু প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইরান আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে চুক্তির বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ দেখতে চাইছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং আর্থিক প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইরানের আলোচক ও রাজনৈতিক নেতারাও বারবার সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ধরনের প্রতারণা, অতিরিক্ত চাপ কিংবা চুক্তি লঙ্ঘনের জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে।

 

হরমুজ প্রণালি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

এই শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালি।বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই রুটকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়।

 

প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং মার্কিন অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার বিষয় আলোচনায় রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের সময়সূচি ও পদ্ধতি নিয়ে এখনো বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

 

লেবানন পরিস্থিতি নতুন বাধা

শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে লেবাননের পরিস্থিতিও।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে হামলা, পাল্টা হামলা এবং নিরাপত্তা অঞ্চল নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। সমঝোতা স্মারকে শত্রুতা কমানোর কথা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো সামরিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। ফলে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যে কোনো চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

 

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে কঠিন লড়াই

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখনো সামনে। কারণ পরবর্তী পর্যায়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রযুক্তিগত আলোচনা। এই বিষয়টিই বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল ইস্যু।ওয়াশিংটন চাইছে ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রমে কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নিক। অন্যদিকে তেহরান বলছে, তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।

 

ফলে ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা তৈরিতে যত সময় লেগেছে, পারমাণবিক প্রশ্নে চূড়ান্ত সমাধানে তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

৬০ দিনের সময়সীমা দ্রুত কমছে

চুক্তির আওতায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পরবর্তী আলোচনা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ায় সেই সময়সীমা দ্রুত কমে আসছে। আলোচনার প্রতিটি বিলম্ব নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অচিরেই প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক আলোচনা শুরু না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক মুখোমুখি অবস্থান কিংবা প্রক্সি সংঘাতের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

 

এখন কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে-এমনটা বলছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং তাঁদের মতে, আলোচনা স্থগিত হয়েছে, বাতিল হয়নি। সুইজারল্যান্ড, পাকিস্তান, কাতারসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার কথা বলছে। তবে একই সঙ্গে তারা একে অপরের পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের ওপর। সুইজারল্যান্ডের স্থগিত বৈঠক নতুন কোনো তারিখ পায় কি না, পারমাণবিক আলোচনা শুরু হয় কি না এবং মাঠের বাস্তবতায় লেবানন ও হরমুজ অঞ্চলে উত্তেজনা কমে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি আবারও সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।


সম্পর্কিত নিউজ