{{ news.section.title }}
ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বানচাল করার চেষ্টা করছে : মার্কিন গোয়েন্দা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা হলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করে জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে কিংবা পুরো চুক্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।
প্রতিবেদনে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য তার জোট সরকারের কট্টর ডানপন্থী অংশীদাররা চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই রাজনৈতিক বাস্তবতা নেতানিয়াহুকে এমন পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে, যা ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে।
চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত প্রশমনের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার নতুন কাঠামো এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাব্য পথরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি রাজনৈতিক অঙ্গনের বহু নেতা মনে করছেন, এই সমঝোতা ইরানের ওপর চাপ কমিয়ে দেবে এবং তেহরানকে কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে। দেশটির ডানপন্থী রাজনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশের দাবি, চুক্তিটি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই চুক্তি নিয়ে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নেতানিয়াহু নিজেই। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, দীর্ঘদিন ধরে ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে তার কট্টর সমর্থকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এদিকে লেবানন পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিই সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পরবর্তী আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হবে। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ না হলে শান্তি আলোচনা অর্থবহ পর্যায়ে এগোনো সম্ভব নয়। একই কারণে নির্ধারিত কিছু বৈঠক ইতোমধ্যে স্থগিতও হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ নেই। বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত সমঝোতা এবং লেবানন নীতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। একদিকে তারা ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও উপেক্ষা করতে পারছে না। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তেল আবিবকে সন্তুষ্ট রাখা।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি ইতোমধ্যেই বিশ্ব জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, শান্তির পথ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বরং লেবানন পরিস্থিতি, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আগামী কয়েক সপ্তাহে পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই-ওয়াশিংটন, তেহরান এবং তেল আবিব কি একই পথে এগোতে পারবে, নাকি আস্থার সংকট ও আঞ্চলিক সংঘাত আবারও শান্তির সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দেবে।