{{ news.section.title }}
সুইডেনকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ব্রাজিলকেও টপকাল নেদারল্যান্ডস
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ‘এফ’ গ্রুপে দুর্দান্ত এক প্রদর্শনী উপহার দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে সুইডেনকে ৫-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে শুধু গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি ডাচরা, একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন এক রেকর্ডও গড়েছে। রোনাল্ড কোমানের শিষ্যরা পুরো ম্যাচজুড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় সুইডেনকে কার্যত ম্যাচের বাইরে ছিটকে দেয়।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপে এর আগে মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে সেই ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছিল এবং ফুটবল ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে আছে ইয়োহান ক্রুইফের বিখ্যাত ‘ক্রুইফ টার্ন’-এর জন্য। ৫২ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হলে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার ড্র নয়, বরং গোল উৎসবে মেতে ওঠে ডাচরা।
শুরু থেকেই ডাচদের আধিপত্য
ম্যাচের শুরু থেকেই সুইডেনের রক্ষণভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নেদারল্যান্ডস। মাত্র ৫ মিনিটে কোডি গাকপোর দারুণ এক ক্রস থেকে ব্রায়ান ব্রবি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর ১৭ মিনিটে ডেনজেল ডামফ্রিজের নিখুঁত ক্রসে আবারও লক্ষ্যভেদ করেন ব্রবি। ফলে প্রথম ১৭ মিনিটেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস।
ব্রবির দ্বিতীয় গোলটি ছিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের ইতিহাসের ১০০তম গোল। এই মাইলফলক স্পর্শ করে ডাচরা বিশ্বকাপ ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত যোগ করে।
তবে স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে ম্যাচটি পুরোপুরি একতরফা ছিল। বাস্তবে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে সুইডেন ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে। ভিক্টর ইয়োকেরেস, আলেকসান্দার ইসাক এবং অ্যান্থনি এলাঙ্গার নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালায় তারা। কিন্তু গোলের সামনে গিয়ে ব্যর্থ হয় সুইডিশ ফরোয়ার্ডরা।
দ্বিতীয়ার্ধে গাকপোর ঝড়
বিরতির পর মাঠে নেমেই আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে নেদারল্যান্ডস। ৪৭ মিনিটে ডামফ্রিজের আরেকটি ক্রস থেকে গোল করেন কোডি গাকপো। মাত্র সাত মিনিট পর, ৫৪ মিনিটে ক্রিসেনসিও সমারভিলের পাস ধরে নিচু শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন লিভারপুল তারকা।
৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পরও হাল ছাড়েনি সুইডেন। ৫৯ মিনিটে অ্যান্থনি এলাঙ্গা একটি গোল শোধ করে ব্যবধান কমান। সেটিই ছিল ম্যাচে বার্ট ভারব্রুগেনের একমাত্র ভুল কিংবা বলা যায় একমাত্র গোল, যা তিনি ঠেকাতে পারেননি।
শেষ দিকে সুইডেন একাধিক আক্রমণ করলেও গোলের দেখা পায়নি। বরং ৮৯ মিনিটে সমারভিল নিজেই গোল করে ৫-১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত করেন।
স্কোরলাইন যা বলে না
পরিসংখ্যান বলছে, আক্রমণের সংখ্যায় কিন্তু সুইডেন পিছিয়ে ছিল না। পুরো ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ১০টি শট নিয়ে ৭টি পোস্টে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে সুইডেন নেয় ১৬টি শট, যার মধ্যে ৮টি ছিল লক্ষ্যভেদী। কিন্তু পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ফিনিশিং। ডাচরা সুযোগ পেয়েছে কম, কিন্তু তা গোলে রূপান্তর করেছে দক্ষতার সঙ্গে। বিপরীতে সুইডেন একাধিক সুযোগ পেয়েও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। ডাচ গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর কয়েকটি সেভ না হলে ম্যাচের চিত্র আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত।
বিশ্বকাপে দ্রুততম ১০০ গোলের মাইলফলক
কোডি গাকপোর দ্বিতীয় গোলটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বিশ্বকাপের চলমান আসরেরও একটি বিশেষ রেকর্ড তৈরি করেছে। এই গোলের মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যা ১০০ স্পর্শ করে। মাত্র ৩৩টি ম্যাচে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ হয়েছে, যা ১৯৫৮ সালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্রুততম শত গোলের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সুইডেনের লজ্জার দুই রেকর্ড
এই ম্যাচে হেরে সুইডেন বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়েছে। প্রথমত, বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে তারা এক ম্যাচে অন্তত ৮টি শট পোস্টে রেখেও ৪ বা তার বেশি গোল ব্যবধানে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, প্রথম ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ৪ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে হারার ঘটনাও বিশ্বকাপে এর আগে দেখা যায়নি।
ফলে সুইডেনের জন্য এই ম্যাচটি শুধুই একটি পরাজয় নয়, বরং রেকর্ডবইয়ে হতাশাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ব্রাজিলকে পেছনে ফেলল নেদারল্যান্ডস
জয়ের পাশাপাশি বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ডও গড়েছে নেদারল্যান্ডস। এই ম্যাচের পর বিশ্বকাপে টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়েছে তারা। এর আগে এই রেকর্ডে ব্রাজিলের সঙ্গে যৌথভাবে ছিল ডাচরা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত ছিল পেলের ব্রাজিল।
নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপে সর্বশেষ হেরেছিল ২০১০ সালের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে। এরপর ২০১৪, ২০২২ এবং বর্তমান ২০২৬ আসর মিলিয়ে তারা আর কোনো ম্যাচে পরাজিত হয়নি। যদিও ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয়েছিল, তবে ফিফার পরিসংখ্যানে সেগুলো ড্র হিসেবেই গণ্য হয়।
নকআউটের পথে বড় পদক্ষেপ
এই জয়ের ফলে ‘এফ’ গ্রুপে দুই ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে উঠে গেছে নেদারল্যান্ডস। নকআউট পর্বে ওঠার দৌড়ে এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রোনাল্ড কোমানের দল।
সুইডেন দুই ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জাপানের সংগ্রহ এক ম্যাচে ১ পয়েন্ট, আর তিউনিসিয়া এখনো কোনো পয়েন্ট অর্জন করতে পারেনি।
বিশ্বকাপের শুরুতে জাপানের বিপক্ষে দুইবার এগিয়েও জয় হারানোর আক্ষেপ ছিল নেদারল্যান্ডসের। সেই হতাশার জবাব যেন এক ম্যাচেই দিয়ে দিল ডাচরা। আক্রমণভাগের ধার, মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা দেখে ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই এখন নেদারল্যান্ডসকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। যদি গাকপো, ব্রবি, ডামফ্রিজ ও সমারভিলরা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ সালের রানার্স-আপ আক্ষেপ ঘুচিয়ে এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতেই পারে কমলালেবুর দেশের সমর্থকেরা।