{{ news.section.title }}
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৩২, ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আশা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলার ফলে শুধু হতাহতের সংখ্যাই বাড়ছে না, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সহিংসতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে এবং সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সফলতা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রোববার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণের ঘটনায় একদিনেই বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ, টায়ার, সিডন এবং পশ্চিম বেকা অঞ্চলে একাধিক হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, নাবাতিহ জেলায় পরিচালিত হামলাগুলো ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সেখানে অন্তত ১৬ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে কাফর রেমান এলাকায় একটি হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
টায়ারের বারিশ এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্য-বাবা, মা ও তাদের দুই সন্তান-নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। পশ্চিম বেকা অঞ্চলের সোহমোর এলাকায় একটি বাড়িতে চালানো বিমান হামলায় আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। সিডন জেলার কানারিতে হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত সাতজন এবং আহত হয়েছেন আরও ১৩ জন।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হতাহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক।
আল জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। বরং অনেক এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর নিরাপদে ঘরে ফেরার চেষ্টা করা অনেক পরিবার আবারও হামলার মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান কূটনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে কার্যকর ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সদ্য শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় সহিংসতা হ্রাস করা। সেই প্রেক্ষাপটে লেবাননে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পুরো উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এদিকে লেবাননের সেনাবাহিনীও বিরল কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেছে, দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতেই ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। সেনাবাহিনীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তা নয়, কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্যও বড় হুমকি।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে কয়েক ডজন রকেট নিক্ষেপ করেছে, যা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল। উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই লেবাননের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। কারণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ, লেবানন সরকার এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর মধ্যেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আগামী ২৩ ও ২৫ জুন লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন আশা করছে, এই আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তবে হিজবুল্লাহকে আলোচনার বাইরে রাখা এবং দক্ষিণ লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
লেবাননের পার্লামেন্টে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধি আলী ফাইয়াদ ইতোমধ্যে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিত থাকা অবস্থায় কোনো কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়। তার বক্তব্য নতুন করে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মাঠের বাস্তবতা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে।
ফলে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে লেবাননে চলমান সহিংসতা অব্যাহত থাকলে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল–জাজিরা